Saturday , June 6 2020
সর্বশেষ খবর:

সামাজিক দূরত্ব বজায়কালীন মানসিক স্বাস্থ্য

শামীম হামিদী পিএইচডি  : মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই সামাজিক জীব। সঙ্গবদ্ধ জীবনের মধ্যেই মানুষ খুজে পায় তার পূর্ণতা। বর্তমানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত পুরো বিশ্ব। যার একমাত্র প্রতিকার হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব তৈরি  করা। এটিকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)  বর্তমানে প্যানাডোমিক হিসেবে ঘোষনা করেছে। এর ব্যাপক বিস্থার রোধে বিশ্বের বহুদেশ তাদের নাগরিকদের কোয়ারেন্টিন এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলেছেন। অনেক ব্যাস্তময় শহরকে করে দিয়েছে লকডাউন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজের তথা সমাজের অন্যান্য মানুষের কল্যানে নিজেকেও করতে হচ্ছে সমাজ থেকে  বিচ্ছিন্ন। WHO এর তথ্যমতে বর্তমানে নিজেদের মধ্যে সামাজিক দুরত্ব তৈরির মাধ্যমেই আমরা একমাত্র এই মহামারিকে নিয়ন্ত্রন করতে পারি।

এই ব্যাস্তময় পৃথিবীতে মাত্র কিছুদিন আগে আমরা এটা কল্পনাও করতে পারেনি যে পৃথিবী এভাবে থেমে যেতে পারে কোন এক অদৃশ্য ভয়ে। বাধ্য হয়েই আমাদের অনেককে থাকতে হচ্ছে হোম কোয়ারেন্টিনে। হোম কোয়ারেন্টিন এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা আমাদের সকলের কাছেই এক নতুন অভিজ্ঞতা। কিছু দিন আগেও মনে হতো যদি বড় একটা ছুটি পেতাম টানা তিনদিন ঘুমাতাম,বা  পরিবারকে কতদিন সময় দিতে পারিনা ছুটি পেলে একদম পরিবারকে সময় দিতাম। হয়ত আজ দুইএকদিনেই  তারা হাপিয়ে উঠেছেন বা মন ছুয়ে গেছে বিষাদের ছায়ায় হোম কোয়ারেন্টিনে এবং সামাজিক দূরত্বে থেকে থেকে ।

মেডিকেল জার্নাল  দা লানসেট এর সমসাময়িক গবেষনার মতে  কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষদের অনেক ধরনের মানুষিক সমস্যা হয়ে থাকে তার মধ্যে ঘুমের সমস্যা, বিষন্নতা, দুশ্চিন্তা, রাগ এমনকি পোস্ট ট্রামাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) হতে পারে।

তবে আশার বিষয় হলো হোম কোয়ারেন্টিন এবং সামাজিক দূরত্ব মানে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা  নয়। সামাজ বিজ্ঞানীদের মতে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হল এমন একটি অবস্থা যেখানে ব্যাক্তি সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, এমনকি তার পরিবার, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব ও তার সংস্কৃতি থেকেও পুরাপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে অথবা  সমাজের অন্য সকলের থেকে সে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে।

পক্ষান্তরে হোম কোয়ারেন্টিন এবং সামাজিক দুরত্তে কিন্তু আমরা আমাদের সমাজ থেকে, আমাদের পরিবার থেকে, সামাজিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন নই। শুধুমাত্র স্পর্শ ও সঙ্গ এড়িয়ে চলি। ভার্চুয়াল জগতে আমাদের অনেক বেশি সামাজিক যোগাযোগ বেড়েছে। লক্ষ্য করবেন আমাদের সামাজিক দ্বায়বদ্ধতা অনেক বেড়েছে আমরা একে অপরের অনেক বেশি কেয়ার  নিচ্ছি মোবাইল, ম্যাসেঞ্জার, ফেসবুকে  সকলের খোজ খবর নেওয়া বেড়ে গেছে , পরিবারকে সময় দিচ্ছি, প্রিয়জনদের বারবার করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করছি। বৃদ্ধ বাবা, মা, আত্মীয়দের আলাদা কেয়ার নিচ্ছি।

আমাদের নিজেদের অজান্তেই পশুবৃত্ত দূর হয়ে মানুষত্ব যাগ্রত হচ্ছে। সামাজিক সংহতি তৈরি হচ্ছে। ধর্মীয় গোরামি নিপাত যাচ্ছে। রাজনীতিতে সহমর্মীতা ফিরে আসছে। করোনার প্রকোপ আমাদের মানবিক হতে শিখাচ্ছে আমরা দেখছি নতুন এক পৃথিবী। এতকিছুর পরেও আমরা একে সামাজিক দূরত্ব বলতে পারিনা। আমরা একে সমাজকে টিকিয়ে রাখার কৌশলগত দূরত্ব বলতে পারি।

তথাপিয় আমাদের স্বাভাবিক অভ্যাষের বাহিরে গিয়ে আমরা হোম কোয়ারেন্টিন  এবং সামাজিক দূরত্বে থাকাকালিন সময় আমাদের মানসিক স্বাস্থের উপর অনেক নেতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। সে গুলোকে আমরা উত্তরন করতে পারি আমাদের সমন্বিত কর্ম পদ্ধতির মাধ্যমে।

সরকার তথা রাস্ট্র তার নাগরিকদের মানসিক  স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন তার নাগরিকদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা ও মৌলিক চাহিদা পূরনের লক্ষে বিভিন্ন প্রনেদনা প্রদান করতে পারে। যা সল্প আকারের হলেও বাংলাদেশের সরকার প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে প্রদেয় ভাষনে ঘোষনা দিয়েছেন। সেটাকে আরো জন সম্পৃক্ত করে পরিধি বাড়ানো যেতে পারে।

সকল চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান সমূহ তাদের সকল কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা প্রদান ও নিয়মিত তাদের খোঁজ খবর রেখে মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

এছারাও হোম কোয়ারেন্টিন ও সামাজিক দূরত্ব বজায় কালিন সময়ে ব্যাক্তি তার মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নিচের কাজ গুলো করতে পারেন।

১. প্রতিদিনকার একটা রুটিন তৈরি করা –

দিনের  শুরুতেই আজকের দিনের একটি লিখিত তালিকা  তৈরি করা এবং সে অনুযায়ি দিনটি অতিবাহিত করা।

২. মেডিটেশন ও ব্যায়াম –

প্রতিদিন মেডিটেশন  করার একটা অভ্যাষ গড়ে তোলা সেটা আপনার পছন্দমত হতে পারে যেমন ধরুন কারো ক্ষেত্রে সেটা নামাজের মাধ্যমে বা ধর্মীয় প্রার্থনার মাধ্যমে হতে পারে , আবার অনেকের কোরআন তেলাওয়াত বা সঙ্গীত চর্চার মাধ্যমে হতে পারে। যেটা আপনার  মেডিটেশনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে আপনি সেটাই করবেন। পাশাপাশি ইনডোরে ব্যায়াম গুলো করার একটা অভ্যাস তৈরি করবেন তাতে মন ও শরির দুটোই ভাল থাকবে।

৩. নতুন কোনো পারসোনাল  স্কিল ডেভলপ করা –

বর্তমানে ভার্চুয়াল যুগে কোন কিছু শিখতে আর প্রতিষ্ঠানে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়।  তাই অবসর কালিন এই সময়ে আপনি নতুন নতুন স্কিল ডেভলপ করতে পারেন।  যেমন কম্পিউটার এর এডভান্স লেভেল লার্নিং , ইংরেজী শিক্ষার কোনো কোর্স , অনলাইনে কোরআন শিক্ষা , নতুন কোনো ভাষা শিক্ষা অথবা অনলাইনে নতুন কোনো কোর্সে এনরোল হওয়া ইত্যাদি।

৪. নিজের যত্ন নেওয়া –

নানান ব্যাস্ততায় আমরা আমাদের শরিরের যত্ন নেওয়ার সময় পাই না তাই এটা হতে পারে নিজের যত্ন নেওয়ার একটা আদর্শ সময়। যেমন পর্যাপ্ত পরিমানে ঘুমানো , পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহন অন্যান্য।

৫. সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি –

দৈনন্দিন কাজের ব্যাস্ততায় আন্তরিকতা থাকা সত্বেও চেনা যানা কাছের অনেকের খোজ খবর নেওয়া হয়ে ঊঠে না।  তাই অবসর কালিন এ সময়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যাবহার করে আত্বীয় স্বজন , বন্ধু বান্ধব , সহকর্মী সহ চেনা যানা সকলের সাথে সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করা।

৬. পরিবারকে সময় দেওয়া  –

ব্যাস্ততায় ভরা এ জীবনে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয় আমাদের পরিবারের সদস্যরা। তাই এসময়ে আপনার পরিবারের সাথে নিবির কিছু সময় কাটাতে পারেন। তবে অবশ্যই আপনার সুস্থতা ও বাড়ির অন্য সদস্যদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে।

৭. নিজেকে সময় দিন –

যে কাজ গুলো করতে আপনার ভাল লাগে তা অল্প সময়ের জন্য হলেও প্রতিদিন করুন। যেমন লেখালেখি,  আপনার পছন্দের বই পরা , নাটক, সিনেমা , গান বা ধর্মীয় আলোচনা শোনা  ইত্যাদি।

৮. ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলুন – মুসলিম হলে নিয়িমিত নামাজ , কোরান তেলাওয়াত , হাদিস অধ্যায়ন সহ ধর্মীয় অন্যান্য কার্যক্রম বাড়িতে পালন করুন। অন্য ধর্মের হলে নিজ ধর্মের আচার অনুষ্ঠান বাড়িতে পালন করুন এতে মানষিক শান্তি পাবেন।

৯. সবসময় পজিটিভ চিন্তা করুন – আজকের দিনটির জন্য বাচুন ফিউচারে কি হবে তা পরে চিন্তা করুন। কারন আজকে আপনি যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন সেটা শুধু আপনার না সকলের সমস্যা। তাই নেগিটিভ চিন্তা থেকে দূরে থাকুন।

১০. প্রযুক্তি কাজে লাগান –

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারি তাই বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রযুক্তির ব্যাবহার শিখুন যেমন ধরুন টেলিমিডিসিন , হোম ডেলিভারি, ই কমার্স,  ই লার্নিং , ই সেবা ইত্যাদির যথাযথ ব্যাবহার করুন।

১১. অন্যকে সাহায্য করুন –

আপনার নিজের সামার্থ অনুযায়ি অন্যকে সাহায্য করুন।  এর মাধ্যমে আপনার মানষিক শান্তি ও সামাজিক স্থিতিশিলতা বজায় থাকবে।

সর্বোপরি আপনার মানসিক শক্তিকে বৃদ্ধি করে হোম কোয়ারেন্টিন ও সামাজিক দূরত্বে  থাকা কালিন সময়ে নিজের, পরিবারের সর্বোপরি দেশ ও জাতির কল্যানে নিজেকে নিয়োজিত রাখুন এবং নিজের তথ্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করুন।  তাহলে আমরা সকলে মিলে এই ক্রান্তি কাল অতিক্রম করতে পারবো ইনশাআল্লাহ। করোনা ভাইরাসকে ভয় নয় কিছু নিয়ম পালন করে জয় করা যায়। আসুন সকলে নিয়মকে জানি ও মানি।  পৃথিবীকে করোনা মুক্ত করার প্রত্যয় নিতে সকলে মিলেমিশে কাজ করি। আর সপ্ন দেখি  করোনার মুক্তির সাথে সমাজের সকল কুলশিতা দূর হোক। আগামির সূর্য উদয় হোক এক শোষন মহামারি ও বিদ্ধেষ মুক্ত পৃথিবীর।

 

লেখক : গবেষক, বাংলাদেশ রিচার্স এন্ড ডেভলপমেন্ট ফাউন্ডেশন

drshamimhamide@gmail.com

Comments

comments

Check Also

৭ই মার্চের ভাষণ : শেখ মুজিব যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন

কাদির কল্লোল : ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ এসেছিল এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমিতে। আন্দোলনের একপর্যায়ে মার্চের প্রথম …

বেড়েই চলেছে মঠবাড়িয়ার কালীপ্রতিমার উচ্চতা : এবারে ৯০ ফুট

মো. শাহাদাৎ হোসেন : পিরোজপুররের মঠবাড়িয়া উপজেলার উত্তর মঠবাড়িয়া গ্রামের নির্মল চাঁদ ঠাকুরের বাড়িতে ৯০ …

error: Content is protected !!