বুধবার , সেপ্টেম্বর ২৩ ২০২০
Breaking News

বিরল মুসলিম স্থাপত্যকলা মঠবাড়িয়ার মমিন মসজিদ

জহিরুল ইসলাম : দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র কাঠের তৈরি দৃষ্টিনন্দন মুসলিম স্থাপত্যকলাটির অবস্থান পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায়। উপজেলার বুড়িরচর গ্রামের আকনবাড়িতে অবস্থিত এই মসজিদের নাম মমিন মসজিদ। সম্পূর্ণ কাঠের নির্মিত কারুকার্য ও ক্যালিগ্রাফি খচিত এ মসজিদটিতে কোনো ধরনের লোহা বা তারকাঁটা ব্যবহার করা হয়নি। এসব কারুকাজে ব্যবহার করা হয়েছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রঙ। ১৯১৩ সালে সুন্দরবন সংলগ্ন বুড়িরচর গ্রামের মমিন উদ্দিন আকন নিজ বাড়িতে এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ২১ জন কারিগর ৭ বছরে ১৬ হাত দৈর্ঘ্য, ১২ হাত প্রস্থ ও ১৫ হাত উচ্চতার এ মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা দিয়ে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়। জানা যায়, এ ধরনের কাঠের তৈরি মসজিদ একসময় ভারতের কাশ্মীরে একটি ছিল। ১৮৮৫ সালের ভূমিকম্পে সেটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে মঠবাড়িয়ার মমিন মসজিদই এ ধরনের একমাত্র নিদর্শনে পরিণত হয়। দূরের মসজিদে নামাজ পড়তে যেতে কষ্ট হয় বলে যুবক মমিন উদ্দিন আকন নিজ বাড়িতে একটি মসজিদ নির্মাণের চিন্তা করলেন। একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণের লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন মসজিদ পরিদর্শনের মাধ্যমে সেগুলোর ডিজাইন ও ক্যালিগ্রাফি সম্পর্কে ধারণা অর্জন করলেন। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মসজিদই তখন ইট অথবা পাথরের দ্বারা তৈরি। তাই তিনিও প্রথমে ইট দিয়ে মসজিদ নির্মাণের চিন্তা করলেন। পরে তিনি মসজিদটিকে সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরির পরিকল্পনা করেন। দুষ্প্রাপ্য লোহাকাঠ ও বার্মা সেগুনকাঠের ওপর বিভিন্ন নকশা করে তাতে ব্যবহার করা হয় প্রাকৃতিক রঙ। মমিন উদ্দিন আকন তার আরবি ভাষা, ইসলামিক সংস্কৃতি ও ক্যালিগ্রাফির জ্ঞানকে এক্ষেত্রে কাজে লাগান। তিনি তত্কালীন বরিশাল জেলার স্বরূপকাঠি থেকে ২১ জন কারিকর এবং চট্টগ্রাম ও বার্মা থেকে কাঠ সংগ্রহ করেন। মসজিদের পুরো পরিকল্পনা, নকশা ও ক্যালিগ্রাফির কাজ করা হয় তার নিজের তত্ত্বাবধানে। মসজিদের প্রবেশদ্বারে একটি এবং মেহরাবে একটি ক্যালিগ্রাফির নকশা বসানো হয়। কিশোরবেলায় মমিন উদ্দিন আকন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা এক নোয়াখালীর মাওলানার কাছে আরবি ও ফারসি ভাষা শেখেন। মাওলানা সাহেব আকনবাড়িতে মক্তব চালাতেন। তাই ধর্মীয় চেতনাবোধ পূর্বেই তার মধ্যে ছিল। তিনি ধর্মীয় প্রণোদনা ও নিজস্ব রুচিবোধ দিয়ে এই উপাসনালয়টিকে সৌকর্যমণ্ডিত করে তোলেন। মমিন মসজিদের শৈলী বিচারে তা স্পষ্ট। এর চারপাশের বেড়া তিনটি অংশে বিভক্ত। উপরে ও নিচে কাঠের কারুকাজ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে দুই পার্টের বেড়া। যার ভেতরে একরকম ও বাইরে অন্যরকম। ভেতরের কারুকাজ করা বেড়াটি খুলে আলাদা করা যায়। ইট দিয়ে নির্মিত অনুচ্চ নিরেট মঞ্চের উপর আয়তাকার পরিকল্পনায় কাঠের জোড়াবদ্ধ বেড়া ও খুঁটির উপর টিনের আটচালা ছাউনি বসিয়ে স্বল্প পরিসরে মমিন মসজিদ নির্মিত হয়েছে। কাঠের বেড়ার মধ্যে আকর্ষণীয় কারুকাজ রয়েছে। সেই কারুকাজের মটিফে ঠাঁই পেয়েছে জ্যামিতিক বিন্যাসে ক্ষুদ্রাকার ফোকর, বরফি, ফুলদানি, স্টাইলিশ কলিসহ বিরুদের ডাঁটা, নাস্তালিক ক্যালিগ্রাফি প্রভৃতি। এর সবকিছুই ধারণ করছে এদেশের লোকজ ঐতিহ্যিক ধারার সর্বশেষ উপাত্ত। উল্লেখ্য, সারা বাংলাদেশে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত মসজিদের সংখ্যা শতাধিক। তার মধ্যে যেগুলো বেশি গুরুত্ব বহন করে সেই সব মসজিদের ছবি জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে। মঠবাড়িয়ার মমিন মসজিদের কয়েকটি আলোকচিত্রও জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

 

 

Comments

comments

Check Also

‘স্যার আমি প্রস্তুত’

মঠবাড়িয়া প্রতিদিন ডেস্ক : দেশের যেকোনো দুর্যোগে সবার মতো এগিয়ে আসে পুলিশও। দেশের চলমান এই …

মঠবাড়িয়ায় বাসাভাড়া মওকুফ করলেন এক আওয়ামী লীগ নেতা

স্টাফ রিপোর্টার : পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া পৌরসভার একটি কলোনির বাসিন্দাদের চলতি মার্চ মাসের বাড়িভাড়া মওকুফ করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!