মঙ্গলবার , সেপ্টেম্বর ২২ ২০২০
Breaking News

নভেম্বর মাস, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং শহীদ নুর হোসেনের চেতনা

মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন :

আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে

মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে, মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্ববে
বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার ভাঙ্গা কল্লোলে।

চির তারুন্যের কবি, পরাধীনতার শিকল ভাংগার দুর্বার শব্দই ছিল যার লেখনীর সুরের ঝংকার। স্বাধীনতার সূর্যের প্রদীপ্ত শিখার পতিচ্ছবি ই যেন কবি নজরুল। যিনি পরাধীনতা, অন্যায়, শোষণ, বঞ্চনার মূলে আঘাত হেনে তারুন্যকে আহবান করেছেন জীবনকে বাজিরেখে নব সৃষ্টির উন্মাদনায়।এই তারুন্য উচ্ছালতার মূর্ত প্রতীক হলেন বাংলার ইতিহাসে গণতন্ত্র মুক্তির নায়ক শহীদ নুর হোসেন।

শহীদ নুর হোসেন বাংলার ইতিহাসে এক জীবন্ত পোষ্টার। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে ইতিহাস লিখে গেলেন তা শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং বিশ্ব ইতিহাসের এক স্বরনীয় অধ্যায়।

১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস ব্যাপী এক রক্ত ক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, পাকিস্তানী হায়েনাদের পরাজিত করে আমরা অর্জন করি স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার সু-বাতাস বেশি দিন বইতে পারেনি। ৭১ এর পরাজিত শকুনেরা রক্ত নেশায়ে মেতে উঠে। ৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট আঘাত হানে বাংলাদেশের মানচিত্রে আর বাঙালীর বুকে। স্বপরিবারে হত্যাকরে স্বাধীনতার স্থপতি, বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে। আর এর মধ্য দিয়ে বাংলার আকাশে ভর করে কালো মেঘের ঘনঘটা। শুরু হয় সৈরতন্ত্রের কালো অধ্যায়। আপামর জনতার মত ও পথ কে উপেক্ষা করে বাঙালী জাতিকে শোকের মাতমে কাঁদিয়ে ১৬/০৮/১৯৭৫ তারিখে ক্ষমতা গ্রহন করে খন্দকার মোস্তাক। ০৬/১১/১৯৭৫ পর্যন্ত স্থায়ীত্ব হয়। এরপর আসেন বিচারপতি এ,এস,এম সায়েম (০৬/১১/১৯৭৫-২১/০৪/১৯৭৭)এর পরে ক্ষমতা নেন লে: জেনারেল জিয়াউর রহমান (২১/০৪/১৯৭৭ – ৩০/০৫/১৯৮১) জেনারেল জিয়াও নিহত হলেন।

এর পরে ক্ষমতার হাত বদল হয়। বিচারপতি আঃ ছত্তার (৩০/০৫/১৯৮১ – ২৩/০৩/১৯৮২) ও বিচারপতি হাসান উদ্দীন চৌধুরীর হাতে (২৪/০৩/১৯৮২ – ১০/১২/১৯৮৩)। এরপর বাংলার আকাশে পূর্নরুপে ঝেকে বসে অবৈধ এরশাদ সরকার (১০/১২/১৯৮৩ – ০৬/১২/১৯৯০).

১০/১২/১৯৮৩ সালে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে স্বৈরশাসক লে: জে: হুসেন মোহাম্মদ এরশাদ। এরশাদ এর শাসন কার্যের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে মানুষ প্রতিবাদী হয়ে উঠে। ১৯৯০ এর ১০ নভেম্বর সে প্রতিবাদ পূর্নতার রুপ পায়। ১০ নভেম্বর ঢাকার রাজ পথে রক্ত গোলাপের চাড়া লাগিয়ে ঘাতকের গুলির আঘাতে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন মুক্ত গণতন্ত্রের প্রতীক শহীদ নুর হোসেন।

শহীদ নুর হোসেন ১০৬১ সলে ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহন করেন। পৈতৃক নিবাস পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার ঝাটিবুনিয়া গ্রামে। বাবা মজিবুর রহমান পেশায় ছিলেন বেবী ট্যাস্কী ড্রাইভার। চার ভাই আর এক বোনের মধ্যে শহীদ নুর হোসে ২য়। ঢাকার বনগ্রামের রাজ সুন্দরী প্রাইমারী স্কুল দিয়ে শিক্ষা জীবন শুরু। প্রাইমারী শেষ করে ঢাকার গ্রাজুয়েট স্কুলে ভর্তি হলেও তা বেশি দূর যেতে পারেনি। ৮ম শ্রেণীতেই থেমে যায় শিক্ষা জীবনের গন্তব্য। পিতার পাশাপাশি ড্রাইভিং পেশাকেই জীবনের পেশা হিসেবে গ্রহন করেন। শিক্ষা জীবন বেশি দূর অতিবাহীত না হলেও সমাজ, দেশ ও রাজনীতি সম্পর্কে ছিলেন বিশেষ সচেতন। তাই কর্মী হিসেবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।পরে ঢাকা বনগ্রাম শাখার প্রচার সম্পাদকের ও দ্বায়িত্ব পালন করেন। মিছিল, মিটিং ও জনগনের অধিকার প্রতিষ্ঠায় শহীদ নুর হোসেন ছিলেন যোগ্য নেতৃত্ত্ব আর বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহনের প্রাণ পুরুষ।

১৯৮৭ এর ১০নভেম্বর হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এর অবৈধ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে ফুসে ওঠে দেশ। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এর নেতৃত্বে আট দলীয় জোট, বি, এন, পি এর নেতৃত্বে সাত দলীয় জোট এবং ওয়ার্কার্স্ পার্টির নেতৃত্বে পাঁচ দলীয় জোট মিলে বিরোধী জোট গঠন করে। স্বৈরশাসকের বিপক্ষে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচী পালন করে। বিরোধী জোটের এ কর্মসূচীতে নেমেছিল মানুষের ঢল। অপরদিকে সরকারের পক্ষ থেকেও একর্মসূচী বানচালের পূর্ন প্রস্ততি গ্রহণ করা হয়। সরকার সারাদেশে জরুরী অবস্থা জারী করে বন্ধ করে সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং। মানুষের যে জোয়ারের স্রোত ঢাকা মূখী হতে শুরু করেছিল তা রোধ করার জন্য বন্ধ করে দেয়া হয় সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা। অবৈধ সরকার মানুষের এ চাওয়াকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নামিয়ে দেয় তার সামরিক, আধাসামরিক বাহিনী। তবুও বাংলার দামাল ছেলেরা থেমে জায়নি। তারা “একদফা এক দাবি, এরশাদ তুই কবে যাবি” এই শ্লোগান নিয়ে এগুতে থাকে সম্মূখ পানে। এই মিছিলে স্রব ছিলেন শহীদ নুর হোসেন। উন্মূক্ত বুকে সাদা রং দিয়ে লিখেন ‘স্বৈরাচার নীপাক যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পা ’।পুলিশ বাহিনী চিনতে ভুল করেনি গণতন্ত্র্রের এই অতন্ত্র প্রহরীকে। মিছিল ঢাকা জিরো পয়েন্টে আসতেই পুলিশ গুলি চালায়। পুলিশের গুলি লক্ষ বস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। সাদা বর্ণ্ রক্তে লাল হয়ে–সচিবালয়ের পিচঢালা পথবেয়ে বিশ্ব সংবাদে পরিণত হয়। জীবন্ত পোষ্ঠার লাশের মধ্যে দিয়ে পরিনত হয় সারা বাংলার মুক্তির দাবীতে। কিন্তু স্বৈরশাসকের বন্দুকের নল নুর হোসেনের প্রাণ কেড়ে নিলেও নুরহোসেনের প্রাণ আঘাত হানে শাসক মসনদে। নুর হোসেনের নাম কাঁপিয়ে দিয়ে ছিল শাসকের ভীত। ফলশ্রুতিতে তড়িঘড়ি করে লাশ দাফন করা হয় যুরাইন গোরস্থানে। প্রথমে দাফন নিয়ে অস্পটতা থাকলেও পরে নিশ্তিত হওয়া যায় যুরাইন গোরস্থানের কবর খোদক আলগীরের স্বীকারোক্তির মাধ্যমে ।

শহীদ নুর হোসেন কাল কে অতিক্রমকারী এক কালজয়ী পুরুষ। তিনি মৃত্যুকে জয় করেছেন। তার মৃত্যুর মধ্যদিয়েই বাংলার আকাশ থেকে স্বৈরশাসকের অবসান হয়। তাই ১০ই নভেম্বর কে ঘোষনা করা হয় শহীদ নুর হোসেন দিবস হিসেবে। নুর হোসেনের রক্তমাখা ঢাকার সেই রাজপথ জিরো পয়েন্ট আজ নুর হোসেন স্কায়ার নামে পরিচিত। নুর হোসেনকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যেও অনেক উল্ল্যেখ যোগ্য লেখালেখি হয়েছে। যেমন শামসুর রহমানের ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ অন্যতম। সর্বপরি ১৯৯১ সালে নুর হোসেনের নামে স্মারক ডাকটিকিট ও প্রকাশ করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য তার গ্রামের বাড়ি মঠবাড়ীয়ায় তেমন কিছু গড়ে ওঠে নাই,এমনকি দক্ষিণ অঞ্চলের অনেকেরেই অজানা শহীদ নুর হোসেনের বাড়ী মঠবাড়ীয়ায় ।তাই মঠবাড়ীয়ায় নুর হোসেনের চেতনাকে জাগরত রেখে তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন পূর্বক কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হোক এটা মঠবাড়িয়া তথা দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি।
আজ নুর হোসেনের আত্তত্যাগের ৩০ বছর পরে জাতির নিকট প্রশ্ন নুর হোসেনর সেই স্বপ্ন আজ কি পূর্ন বাস্তবায়িত হয়েছে? দেশকি আজ পূর্ণ্ ভাবে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ভাবে মুক্তিলাভ করেছে? তাই বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু তনয়া, জননেত্রী শেখ হাসিনার নিকট দাবী ১০ নভেম্বর শহীদ নুর হোসেন দিবস এলে ভাষণ, লেখালেখি, শহীদ মাজারে পুষ্প অর্পণ, আলোচনাসভা ও ছবি আঁকা ইত্যাদির মধ্যে শেষ না করে শহীদ নুর হোসেনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের বাস্তবমুখি পদক্ষেপ গ্রহণ করে জাতিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কিৃতিকভাবে পূর্ন মুক্তির পথ সুগম করতে হবে। তবেই শহীদ নুর হোসেনের আত্মদান স্বার্খক হবে।

 

লেখক:

মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন
বি.এ (সম্মান), এম.এ
এল.এল.বি (অধ্যয়নরত)
ম্যানেজার, সৌদি প্রবাসী হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার
মঠবাড়িয়া, পিরোজপুর।

Comments

comments

Check Also

মঠবাড়িয়ায় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে আর্থিক সহায়তা প্রদান

স্টাফ রিপোর্টার : পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে অলাভজনক সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “নিরাপদ” এর উদ্যোগে …

মঠবাড়িয়ায় সরকারি খাল দখল করে মাছ চাষে পানি দুষিত ।। এলাকাবাসী চরম দুর্ভোগে

স্টাফ রিপোর্টার : পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া পৌর শহরের সবুজ নগর এলাকার সীমানার সরকারি খাল দখল করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!