শুক্রবার , সেপ্টেম্বর ১৮ ২০২০
Breaking News

জননন্দিত খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার (২য় পর্ব)

নূর হোসেইন মোল্লা : পিরোজপুরের মুসলিম লীগ নেতা সাবেক মন্ত্রী খান বাহাদুর সৈয়দ মো. আফজাল এর নেতৃত্বে মে পিরোজপুর মহকুমা শান্তি কমিটি গঠিত হয় (দৈনিক আজাদ মে, ১৯৭১) মঠবাড়িয়ার মুসলিম লীগ নেতা এম.. জব্বার ইঞ্জিনিয়র মে খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দারকে সভাপতি, নিজেকে সিনিয়র সহ সভাপতি, আজাহার আলী মৃধা, . জব্বার কাঞ্চন মিয়া জামায়াতের নেতা ডা. আনিসুর রহমানকে সহসভাপতি, মোজাম্মেল হক কেদার মিয়াকে সেক্রেটারী, . লতিফ অডিটরকে অফিস সেক্রেটারী, মোসারেফ হোসেনকে ক্যাসিয়ার করে ২১ সদস্য বিশিষ্ট মঠবাড়িয়া থানা শান্তি কমিটি গঠন করেন। শান্তি কমিটির কতিপয় সদস্যদের নেতৃত্বে হিন্দুদের বাড়িঘর লুটতরাজ হয়। ১২ মে মঠবাড়িয়ায় শান্তি কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এম.. জব্বার ইঞ্জিনিয়র হিন্দুদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার তাঁকে সমর্থন না করে হিন্দুদের পক্ষ অবলম্বন করেন এবং লুটতরাজ না করার জন্যে জনগণকে অনুরোধ জানান। তিনি তাঁর বাড়িতে হিন্দুদের আশ্রয় দেন। এরপর এম. . জব্বার ইঞ্জিনিয়র খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দারকে বাদ দিয়ে নিজেকে শান্তি কমিটির সভাপতি ঘোষণা  করেন। খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার মাত্র দিন শান্তি কমিটির সভাপতি ছিলেন।

শান্তি কমিটির সভাপতি এম. জব্বার ইঞ্জিনিয়র ১৪ মে তুষখালী বাজারে এক জনসভায় মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং পাকিস্তানকে সমর্থন করে বক্তৃতা দেন। তিনি ফুলঝুড়ি গ্রামের হাবিলদার . রাজ্জাক বিশ্বাস নায়েক . মোতালেব শরিফকে অস্ত্র জমা দিতে নির্দেশ দেন। উল্লেখ্য, মে মুক্তিযুদ্ধ কন্ট্রোল রুম থেকে তাঁরা গোপনে দুইটি রাইফেল নিয়ে ছিলেন। জনসভা শেষে মঠবাড়িয়া থানার .এস.আই. মাহবুবুর রহমান কয়েক জন পুলিশ নিয়ে . রাজ্জাক বিশ্বাস . মোতালেব শরিফকে গ্রেপ্তার অস্ত্র উদ্ধার করতে তাঁদের বাড়িতে গেলে পুলিশের সাথে তুমুল গোলাগুলি হয়। ঘটনাস্থলে . মোতালেব শরিফ মারা যান এবং . রাজ্জাক বিশ্বাস আহত হন। দুই দিন পর তিনি জানখালীতে তার এক আত্মীয়র বাড়িতে মারা যান। গোলাগুলিতে .এস. আই. মাহবুব, দুই জন সিপাই এবং স্থানীয় চৌকিদার জবেদ আলী নিহত হয়। ঘটনার পর ১৫ মে ক্যাপটেন এজাজের নেতৃত্বে পিরোজপুর থেকে শতাধিক পাকিস্তানী সৈন্য ফুলঝুড়ি গ্রামে এসে শতাধিক বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। পরের দিন পাকিস্তানী সৈন্যরা মঠবাড়িয়া শহরে হিন্দুদের বাড়িঘর লুটতারাজ করে এবং দক্ষিণ মিঠাখালী গ্রামের সিকদার বাড়ি পুড়িয়ে দিলে খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার ক্যাপটেন এজাজকে ঘরবাড়ি না পোড়ানো এবং লুটতরাজ না করার জন্যে অনুরোধ করেন। কিন্তু ক্যাপটেন এজাজ তাঁর কথা আমলে নেয়নি। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কবুতরখালী গ্রামের হিন্দুদের বাড়িঘর এবং গুলিসাখালী গ্রামে সওগাতুল আলম সগিরের বাড়ি, মমিনউদ্দিন হাওলাদারের বাড়ি, হোগলপাতি গ্রামে সওগাতুল আলম সগিরের তালই বাড়ি (জমাদ্দার বাড়ি), বড়মাছূয়ার মোল্লাবাড়ি সহ অনেক ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার মুক্তিযুদ্ধের খোঁজখবর রাখতেন। ব্যাপারে উত্তর মিঠাখালী গ্রামের জাকির হোসেন পনু মাষ্টারকে (থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী . খালেকের ভাই) মাঝে মাঝে ডেকে পাঠাতেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজখবর নিতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বহু হিন্দু নরনারী তাঁর বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং সেখান থেকে নিরাপদে ভারতে চলে যায়। ১৬ ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী ভারত বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করলেও মঠবাড়িয়ার রাজাকার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেনি। ১৮ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারের ঘাঁটি মঠবাড়িয়া থানা দখল কারার ঘোষণা দিলে রক্তপাত এড়ানোর জন্য খান সাহেব হাতেম আলী রিক্সায় কালীরহাট দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাক্ষাৎ করে রাজাকার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্যস্থতা করেন। মুক্তিযোদ্ধারা খান সাহেবকে যথাযথ সম্মান প্রদান করেন। এদিনই রাজাকার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ফলে বিনা রক্তপাতে মুক্তিযোদ্ধারা মঠবাড়িয়া দখল করেন। মঠবাড়িয়ার আকাশ বাতাস জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে মুখরিত হয়।

২০ ডিসেম্বর রোজ সোমবার বিকাল ঘটিকায় কে.এম. লতীফ ইনিস্টিটিউশনের খেলার মাঠে ( তখন শহীদ গোলাম মোস্তফা খেলার মাঠ ঘোষিত হয়নি) ৯নং সেক্টরের সুন্দরবন সাবসেক্টরের কমান্ডার ক্যাপটেন জিয়াউদ্দিনকে (তখন মেজর পদে উন্নীত হননি) মঠবাড়িয়ার মুক্তিযোদ্ধারা জনগণের পক্ষ থেকে এক গণসংবর্ধনা প্রদান করেন। খেলার মাঠ লোকে ভর্তি। লেখক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন ক্যাপটেন জিয়া উদ্দিন। সভাপতিত্ব করেন মঠবাড়িয়া থানা কমান্ডিং অফিসার আলতাফ হোসেন আকন। বিশেষ অতিথি ছিলেন সুন্দারবন সাবসেক্টরের সহ অধিনায়ক সামসুল আলম তালুকদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল আলম বাদল, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহতাব উদ্দিন আকন। মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার সোহরাফ হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার ফুলমিয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিলদার তুজাম্বর আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. গাউস আকন, সামসুল আলম কন্ট্রাকটর প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা খান এম.. সাত্তার। খান সাহেব তাঁর বক্তৃতায় হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাজাকার বাহিনীর মানবতা বিরোধী কার্যকালাপ এবং স্বাধীনতাকামী মানুষের বিশেষ করে হিন্দুদের দূর্ভোগের কথা বলেন। আমি ওদেরকে নিষেধ করেছি। ওরা আমার কথা শোনেনি। তিনি আরো বলেন আমার বয়স ৯৪ বছর। বার্ধক্যের কারনে আমি ওদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিতে পারিনি। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আশু মুক্তি দাবী করেন। তিনি ১৯৮২ সালের মার্চ নিজ বাড়িতে মৃত্যু বরণ করেন।

 

লেখকঃ

অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক 

মোবাইল নং০১৭৩০৯৩৫৮৮৭

 

Comments

comments

Check Also

সেপ্টেম্বরের মধ্যেই করোনার ভ্যাকসিন : ঘোষণা অক্সফোর্ড বিজ্ঞানীর

মঠবাড়িয়া প্রতিদিন ডেস্ক : আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রস্তুত হবে বলে আশা দেখিয়েছেন …

করোনার প্রতিষেধক তৈরির প্রক্রিয়া কতদূর?

মঠবাড়িয়া প্রতিদিন ডেস্ক : করোনাভাইরাস বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসে ধ্বংস করার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!