,

শিরোনাম :

সুন্দরবন অঞ্চলের মুকুটহীন সম্রাট মেজর জিয়াউদ্দিন

জহিরুল ইসলাম : মুক্তিযুদ্ধ আর সুন্দরবন, এই দুটি শব্দের সঙ্গে মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন নামটি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হায়েনাদের পরাস্ত করতে সুন্দরবন অঞ্চলকে বেছে নেন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অদম্য সাহসী এই বাঙালি কর্মকর্তা। সেই থেকে তিনি আজীবনের জন্য জড়িয়ে পড়েন সুন্দরবনের প্রেমে। সুন্দরবন আর সুন্দরবন অঞ্চলের জেলেদের বাঁচাতে আজীবন লড়াই করে গেছেন অকুতোভয় এই সৈনিক। এজন্য জলদস্যু ও বনদস্যুদের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান করতে হয় তাকে। তাদের হামলায় কয়েকবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। দুঃখজনক হচ্ছে, বর্তমান প্রজন্মের কাছে জিয়াউদ্দিন নামটি অনেকটা অপরিচিত।

জিয়াউদ্দিনের পূর্বপুরুষের বাড়ি পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়ায়। ভাণ্ডারিয়ার ঐতিহ্যবাহী মিয়া পরিবারের আইনজীবী আফতাব উদ্দিন আহমেদের ছেলে জিয়াউদ্দিন ১৯৫০ সালে পিরোজপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তার চাচাত ভাই।

১৯৬৯ সালে জিয়াউদ্দিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ২০শে মার্চ সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে ছুটিতে বাড়ি আসেন। ২৭শে মার্চের পর যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। প্রথমে তিনি পিরোজপুর শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন এবং সুন্দরবনে ঘাঁটি স্থাপন করে ১৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেন। এ সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের অধীনে সাব-সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হয়ে সুন্দরবনেই সদর দফতর স্থাপন করে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমে ক্যাপ্টেন ও পরে মেজর পদে পদোন্নতি পান।

১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর ও ৭ই নভেম্বরের সেনা অভ্যুত্থানকালে জিয়াউদ্দিন মুক্তিবাহিনী সদস্যদের পুলিশে ভর্তির জন্য পিরোজপুরে অবস্থান করছিলেন। সেই অভ্যুত্থানে তিনি প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করতে না পারায় খুবই মনঃকষ্টে ভুগছিলেন। সেদিন তিনি যদি ঢাকায় থেকে বিপ্লবী সিপাহীদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দিতে পারতেন, তাহলে হয়তো ভিন্ন ইতিহাসের সৃষ্টি হতো। তিনি হয়তো হতে পারতেন রুশ বিপ্লবের মূল কেন্দ্র পেট্রোগ্রাদ সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের কমান্ডার ট্রটস্কির মতো সফল। ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থান হয়তো জিয়াউর রহমানের কাছে হাতছাড়া হতো না।

অভ্যুত্থানের পর জিয়াউদ্দিন জেনারেল জিয়ার অধীনে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তমের কাছে অনুমতি চান সুন্দরবনে তার মুক্তিযুদ্ধের ঘাঁটি এলাকায় বিপ্লবী মুক্ত এলাকা গঠন করতে। চীন বিপ্লবের মাও সেতুং তাকে এ ধরনের চিন্তায় প্রভাবিত করে থাকতে পারেন। স্বাধীনতাপূর্বকালে ছাত্রজীবনে জিয়াউদ্দিন মাওপন্থী ছাত্রসংগঠন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। কিন্তু কর্নেল তাহের তার এ প্রস্তাবে সায় দিলেন না। কারণ জাসদের নীতি ছিল রাজধানীকেন্দ্রিক গণঅভ্যুত্থান, মাও সেতুংয়ের চীন বিপ্লবের মতো ‘গ্রাম থেকে শহর ঘেরাও’ করা নয়।

কর্নেল তাহেরের অনুমতি না পাওয়ার পরও মেজর জিয়াউদ্দিন ফিরে যান তার সুন্দরবনের ঘাঁটিতে। এ সময় জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকার তাকে ধরার জন্য অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করে। কিন্তু তাকে কোনোভাবেই গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ জেলেদের কেউ তাকে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন না বরং তারাই তাকে আশ্রয় দিয়ে রাখছিলেন। অবশেষে ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে মঠবাড়িয়ার মাঝেরচরে এক জেলেনৌকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ ও নৌবাহিনীর এক বিশাল বাহিনী গোটা দুবলার চর ঘেরাও করে তাকে অনেক খুঁজেপেতে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। পুলিশের গোয়েন্দারা তার দীর্ঘ অবয়ব দেখে তাকে শনাক্ত করে। গ্রেফতার করে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় থানায় নেওয়া হয়। এ সময় হাজার হাজার জনতা থানা ঘেরাও করে। তারা শুনেছিল জিয়াউদ্দিনকে হত্যা করা হয়েছে। উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার জন্য তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে থানার ভেতরে নিয়ে জিয়াউদ্দিনকে দেখানোর পর তারা থানা থেকে ফিরে যায়। এরপর কর্নেল তাহের, মেজর জিয়াউদ্দিন এবং জাসদ নেতৃবৃন্দের বিচার হয়। গোপন বিচারে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি এবং মেজর জিয়াউদ্দিনকে যাবজ্জীবনসহ অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।

কর্নেল তাহেরের ফাঁসির রায় ঘোষণার পর জিয়াউদ্দিন রচনা করেন একটি কালোত্তীর্ণ কবিতা। ২১ জুলাই ভোরে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হওয়ার আগ মুহূর্তে তিনি কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন :

জন্মেছি, সারা দেশটাকে কাঁপিয়ে তুলতে, কাঁপিয়ে দিলাম।

জন্মেছি, তোদের শোষণের হাত দুটো ভাঙব বলে, ভেঙে দিলাম।

জন্মেছি, মৃত্যুকে পরাজিত করব বলে, করেই গেলাম

জন্ম আর মৃত্যুর বিশাল পাথর রেখে গেলাম

পাথরের নিচে, শোষক আর শাসকের কবর দিলাম

পৃথিবী, অবশেষে এবারের মতো বিদায় নিলাম।

১৯৮০ সালে জিয়াউদ্দিন সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পান এবং জাসদে যোগ দেন। ১৯৮৩ সাল থেকে তিনি সুন্দরবনের দুবলার চরে মাছের ব্যবসা শুরু করেন এবং জেলেদের আর্থিক নিরাপত্তা, জলদস্যু দমন, দুর্যোগ মোকাবেলায় সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণসহ বিভিন্ন সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। ১৯৮৯ সালে পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবনের সেই উন্মাতাল দিনগুলো  ও সুন্দরবন সমরে ও সুসময় নামে দুটি গ্রন্থ।

২৮ জুলাই ২০১৭ শুক্রবার ভোরে আজীবন যোদ্ধা মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শুক্রবার দুপুরে তিনি সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর।

গত ১২ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয় জিয়াউদ্দিনকে। এর আগে তিনি দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। দুটি কিডনি এবং লিভার খারাপ অবস্থায় তিনি হƒদরোগে আক্রান্ত হন। তখন আইসিইউতে নিয়ে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাকে। শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত আড়াইটার দিকে মেজর জিয়াউদ্দিনের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং ভোরের দিকে চিরবিদায় নেন অকুতোভয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়ে, দুই ভাই ও এক বোন রেখে গেছেন।

 

Comments

comments