,

শিরোনাম :
«» মঠবাড়িয়ায় নির্বাচনী সংঘর্ষে ২ প্রার্থীর ৮ কর্মী আহত «» মঠবাড়িয়ায় যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার «» মঠবাড়িয়ায় দণ্ডপ্রাপ্ত সাইদীর মুক্তি চেয়ে ধানের শীষে ভোট চাওয়ায় মাইক প্রচারম্যান আটক «» মঠবাড়িয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত «» মঠবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীসহ ৬ নেতা বহিষ্কৃত «» তেলিখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. শাহাদাৎ হোসেনের ইন্তেকাল «» স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আশরাফুর রহমানের মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় «» মঠবাড়িয়ায় জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস পালিত «» ইশতেহার আসছে : অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ গড়বে আওয়ামী লীগ «» মঠবাড়িয়ায় মার্কা পেয়েই মহাজোট ও আ’লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর মিছিল

শামসুল হক স্যারকে মনে পড়ে

মো. মিজানুর রহমান নয়ন : মঠবাড়িয়ার উপর একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি বানাতে গিয়ে একটি জায়গায় আটকে গেলাম। মঠবাড়িয়ায় মুক্তিযুদ্ধে, রাজনীতিতে, অভিনয়ে, সাহিত্যে ও সাংবাদিকতায় প্রতি ক্ষেত্রেই বিশেষ কারো না কারো অবদানের কথা আমাদের সবার জানা। তাদের ছবি ও তাদের বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায় বিভিন্ন জায়গায়। তো তাদের ছবি ও তথ্য পেতে আমার তেমন কষ্ট করতে হয়নি। তবে দক্ষিণ জনপদের এই ভূখণ্ডে শিক্ষা  বিস্তারে কার অবদান সবচেয়ে বেশি? এই জনপদের অনেক সন্তানই শিক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন জাতীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে। এ জনপদের দুই ডজনেরও বেশি সন্তান দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। দেশের বাইরেও রয়েছেন কয়েকজন। দেশের নামিদামি কলেজের ও স্কুলের শিক্ষক রয়েছেন কয়েকশ’। এদের মাঝে অনেকেই লেখালেখি  করেন নিজের পাঠ্য বিষয় ও সমাজ উন্নয়নে। এছাড়াও মঠবাড়িয়ায় অবস্থিত যতগুলো কলেজ, স্কুল ও মাদ্রাসা রয়েছে তাতেও শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন কয়েক শত শিক্ষক। অনেকে নিজের নামে বা এলাকার নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা। তাহলে শিক্ষায় এ জনপদের কোন সন্তানের ভূমিকা অগ্রগণ্য? উপকূলীয় একটি অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন যারা তারাই তো শিক্ষায়  অবদানের স্বীকৃতি পাবেন। এ ক্ষেত্রে তিনটি নাম আমাদের সামনে আসে। এর মাঝে একজন এ জনপদের সন্তান। বাকি দুজন বৃহত্তর বরিশালের।

মঠবাড়িয়াসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চেলের ঘরে ঘরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শিক্ষা বিকাশে অবদান রাখছে ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠা প‍াওয়া ঐতিহ্যবাহী কে এম লতীফ ইনিস্টিটিউশন স্কুলটি। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে স্বমহিমায় এখনো ভাস্বর হয়ে আছে দক্ষিণ জনপদের এ বাতিঘরটি। এ বাতিঘরের রূপকার বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া চৌধুরী পরিবারের সন্তান তৎকালীন মঠবাড়িয়ার খাস মহল অফিসার খান বাহাদুর আবদুল লতিফ চৌধুরী। যে সরকারি পদবিটি ব্রিটিশ শাসনকালে থানা সদরের শীর্ষ পদ ছিল, যার উত্তরাধিকার পরে আরসিও ও বর্তমানে সহকারী কমিশনার (ভূমি)। যাদের অনুদানে এ প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন, ব্যাপ্তি ও বিকাশ তারা হলেন বাকেরগঞ্জের তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট জেটি ডনোভন, মঠবাড়িয়ার খাস মহল অফিসার বা আরসিও (রেভিনিউ সার্কেল অফিসার) ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা খান বাহাদুর আবদুল লতীফ চৌধুরী, মঠবাড়িয়ার খান সাহেব হাতেম আলী জোমাদ্দার এমএলএ, মৌলভী খবির উদ্দিন আহমেদ, এস জে এইচ কুণ্ডু, আর কে রায় (শিক্ষক), এইচ এল চক্রবর্তী প্রমুখ। একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করলেই তো হবে না, চাই ভালো মানের শিক্ষক ও তাদের নেতৃত্ব দেবার জন্য একজন যোগ্য প্রধান শিক্ষক। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এমন দুজন মহান মানুষের নেতৃত্বে সফলতার শীর্ষে পৌঁছেছে, তারাই তো শিক্ষায় অবদানে  স্বীকৃতি পাবেন।

তাই শিক্ষায় অবদানের জন্য আমরা প্রতিষ্ঠাতা খান বাহাদুর আবদুল লতীফ চৌধুরী, সাবেক প্রধান শিক্ষক এমাদুল হক স্যার ও শামসুল হক স্যারকে বিনা দ্বিধায় মেনে নিতে পারি। এদের মাঝে শামসুল হক স্যার মঠবাড়িয়ার সন্তান। এবার তাদের ছবি ও তথ্য সংগ্রহের পালা। স্কুলে যোগাযোগ করলাম। স্কুল থেকে মেহেদী ভাই (মঠবাড়িয়া প্রতিদিনের বিশেষ প্রতিনিধি) খান বাহাদুর আবদুল লতিফ চৌধুরী ও এমাদুল হক স্যারের ছবি জোগাড় করলেন। অনেক আগের সাদাকালো ছবি। কিছু কিছু ছবি নষ্ট হয়ে গেছে। তারপরও ঐ ছবিগুলো দিয়ে কাজ করলাম। তবে শামসুল হক স্যারের কোনো ছবি পেলাম না। মনটা খারাপ হয়ে গেল। জানা গেল পারিবারিকভাবে স্যারের ছবি প্রকাশ করতে বারণ রয়েছে। মঠবাড়িয়া প্রতিদিনের সম্পাদক জহির ভাই চেষ্টা করেও যোগাড় করতে পারলেন না। তাই স্যারের ছবি ছাড়াই তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করতে হয়েছিল। কয়েক দিন আগে জহির ভাই হঠাৎ ফোন করে বললেন, খুশির খবর আছে। স্যারের ছবি যোগাড় হয়েছে। কীভাবে স্যারের ছবি পাওয়া গেল তা হয়তো তার আলাদা কোনো লেখায় পাওয়া যাবে। আজ স্যারের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে স্যারকে নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ।

১৯৩০ সালে পূর্ব সাপলেজা (ঝাটিবুনিয়া) গ্রামে সম্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন দক্ষিণ জনপদে শিক্ষা বিস্তারের মহান পুরুষ শামসুল হক স্যার। পিতা স্কুলশিক্ষক আবুল কাসেম মিয়া এবং মাতা আবেজান বিবির আট সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পাথরঘাটা কেএমএইচ ইনিস্টিটিউশন থেকে ১৯৪৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন।
শামসুল হক ১৯৪৯ সালে ঢাকা বোর্ড থেকে ইন্টারমেডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন খুলনা বিএল কলেজে বিএসসিতে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে তিনি বিএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে এমএসসিতে ভর্তি হন। এমএসসি ১ম পর্বের পরীক্ষার সময় দুর্ঘটনায় তাঁর ডান হাতের আঙুল কেটে যাওয়ায় তিনি এমএসসি শেষ না করেই পাথরঘাটার একটি স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন।

এরপর কয়েকটি স্কুলে অল্প কিছুদিন করে শিক্ষকতা করে ১৯৫৫ সালের প্রথম দিকে গণিতের সহকারী শিক্ষক হিসেবে তিনি কে এম লতীফ স্কুলে যোগদান করেন। তিনি শুধু গণিত বিষয়ই নয়, বিজ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি বা অন্য যে কোনো বিষয়ে ছিলেন সমান পারদর্শী। তবে তিনি গণিত ও বিজ্ঞান পড়াতে ভালোবাসতেন। তিনি বলতেন, গণিত হচ্ছে বিজ্ঞানের ভাষা। আবার বলতেন, যে গণিত জানে না, সে বিজ্ঞান তো জানেই না, কুসংস্কার হতে সে  মুক্ত হতে পারে না । তাঁর শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েই এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ১৯৫৫ সালে ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম, ১৯৬৫ সালে ঢাকা বোর্ডে অষ্টম, ১৯৬৬ সালে যশোর বোর্ডে প্রথম, ১৯৬৭ সালে যশোর বোর্ডে প্রথম হয়েছিল। ১৯৭২ সালের ১৬ই জানুয়ারি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন আলোকিত এই মানুষটি। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটির ধারাবাহিক সফলতার দেখাতে থাকে। ১৯৭৩ সালে যশোর বোর্ডে তৃতীয়, ১৯৮২ সালে যশোর বোর্ডে প্রথম ও ষষ্ঠদশ, ১৯৮৩ সালে যশোর বোর্ডে তৃতীয়, ১৯৮৪ সালে যশোর বোর্ডে প্রথম, ১৯৮৯ সালে যশোর বোর্ডে চতুর্দশ স্থান অর্জন করেছিল। এছাড়াও ১৯৮৮ সালে বিভাগের শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছিল এবং ঐ বছর তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন । যা এখন  ইতিহাসের অংশ। বর্তমানে এই ইতিহাসের ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে এই প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৯০ সালের ৩১শে ডিসেম্বর কর্মজীবন শেষ করে অবসর গ্রহণ করেন শিক্ষাকে জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নেওয়া দক্ষিণ জনপদের এই মহান পুরুষ। ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসের ২০ তারিখ মঙ্গলবার এই মহান মানুষটি আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আসলে তিনি কি চলে গেছেন? না, তিনি আছেন আমাদের মাঝে তাঁর কর্মে। তিনি চলে যেতে পারেন না। তিনি আমাদের জ্ঞানে, মননে ও স্বপ্নে আছেন এবং থাকবেন। কেননা তিনিই তো আমাদের জ্ঞান দিয়েছেন। স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আমাদের মনকে সাজিয়েছেন আপন মননে। মঠবাড়িয়ায় প্রতিষ্ঠিত যারা তাদের দিকে তাকালে তাদের মাঝেই স্যারকে খুঁজে পাই। স্যার যেদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন সে সময় আমি ক্লাস এইটে পড়ি। স্যারের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে স্কুল ছুটি হল। শিক্ষক ছাত্র পিয়নসহ স্কুলের সবার চোখে জল। সবাই স্যারের বাসার দিকে রওনা হলাম। ইতোমধ্যে খবর এলো স্যারকে স্কুলে নিয়ে আসা হচ্ছে। যে স্কুলে তিনি কাটিয়েছেন জীবনের সেরা সময় সেই ১৯৫৫ থেকে ৯০ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৬ বছর, সেখানেই তাঁকে নিয়ে আসা হচ্ছে। যে প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে সাজিয়েছেন তিল তিল করে, যে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি জায়গায়, প্রতিটি বিন্দুতে তাঁর স্পর্শ,  সেখানেই  তিনি ফিরে আসছেন। তিনি আসবেন। আমরা অপেক্ষায়। তিনি আসলেন। তবে নিজে হেঁটে নয়, অন্যের কাঁধে ভর করে। স্যারকে রাখা হলো স্কুলের সামনে। আমরা সারিবদ্ধভাবে স্যারকে দেখলাম। স্যার ঘুমিয়ে আছেন। তাঁর শুভ্র দাড়ি ও হাস্যোজ্জ্বল চেহারাটা বলে দিচ্ছে তিনি ভালো আছেন। সেদিন মঠবাড়িয়া বাজারের প্রায় দোকানই বন্ধ হয়ে গেল। স্যারকে শেষবারের মতো একটিবার দেখবেন বলে মানুষের ঢল নামল।

মঠবাড়িয়ার সব রাস্তায় মানুষের স্রোত কে এম লতীফ স্কুলের দিকে। সেদিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। প্রকৃতিও জানান দিল, সে ভালো নেই। স্যারের মৃত্যুতে প্রকৃতিও কাঁদছে। শহীদ মোস্তফা খেলার মাঠে স্যারের জানাজা অনুষ্ঠিত হলো। সেদিন মাঠে তিল পরিমাণ জায়গা ফাঁকা ছিল না। পরে তাঁর বাড়ির সামনে মঠবাড়িয়া-তুষখালী রাস্তার পাশে স্যারকে দাফন করা হল। তখন পারিবারিকভাবে একটা কথা  শুনেছিলাম । কথাটা এরকম, সারাটা জীবন যিনি জটিল গণিতের সহজ সমাধান দিতেন, তিনিই নাকি মৃত্যুর আগের ২-৩ রাত স্বপ্নে  সহজ গণিতের সমাধানও মেলাতে পারছিলেন না। তখন তিনি নিজেই বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর দিন ফুরিয়ে এসেছে।

স্যারের সাথে আমার প্রথম দেখা ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে। আমাকে বাবা স্কুলে ভর্তি করিয়ে স্যারের সাথে দেখা করাতে গিয়েছিলেন। আমার এখনো মনে আছে সেদিনের কথা। বাবা স্যারের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইলেন। স্যার বাবার নাম ধরে ডেকে বললেন, মজিবর এসো। বাবাকে চেয়ারে বসতে বললেন। বাবা বসলেন না। আমি তখন বুঝিনি, বাবা কেন বসলেন না। পরে বুঝেছি স্যারের মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকে সম্মান করে বাবা বসেননি। কারণ বাবাও যে স্যারের ছাত্র। স্যার আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ও কে? বাবা বললেন, আমার ছোট ছেলে (তখনও আমার ছোট ভাইয়ের জন্ম হয়নি বলে আমিই ছোট)। স্যার আমার নাম ও ভর্তি পরীক্ষায় কততম হয়েছি জিজ্ঞেস করলেন। আমি ভয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে, মো. মিজানুর রহমান ও ২১তম এটুকুই বললাম। বাবা স্যারকে সালাম করতে বললেন। আমি স্যারকে জীবনের প্রথম ও শেষবারের মতো সালাম করলাম। বাবা স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। বাবার সাথে বাসায় ফিরছিলাম, তখন বাবা স্কুল ও স্যারদের সম্পর্কে আমাকে ধারণা দিচ্ছিলেন। তখনও স্যারের সাদা শুভ্র দাড়ি, সাদা পায়জামা ও পাঞ্জাবি এবং ব্যক্তিত্ব আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।

স্যারের একটি মাত্র ক্লাস পেয়েছিলাম আমি। ১৯৯০ সালের জানুয়ারির শেষ বা ফেব্রুয়ারির প্রথমের দিকের কথা। আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ছি। ঐদিনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় ক্লাস হবে। আমাদের নির্ধারিত স্যার ওইদিন অনুপস্থিত ছিলেন। তাই স্যার এসেছিলেন আমাদের ক্লাসে। ওইদিনের কথা আমার স্মৃতিতে আজও গেঁথে আছে। আমাদের আগ্রহ বেশি থাকার কারণ হেড স্যারের প্রথম ক্লাস। যার গল্প শুনে এসেছি ছোটবেলা থেকে। যিনি সব বিষয় পড়াতে পারেন। যার ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব সবার কাছে সমাদৃত। তাছাড়া স্যার ওইবছরের শেষেরদিকে স্কুল থেকে অবসরে যাচ্ছেন। স্যার ক্লাসে এসে চেয়ারে বসলেন। ক্লাসে টুঁ শব্দটি নেই। আমরা স্যারের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার কাছে সেদিন মনে হয়েছিল সৃষ্টিকর্তা একজন দেবদূতকে পাঠিয়েছেন আমাদের মাঝে। সেদিন স্যার আমাদের পড়ালেন না। জীবনে চলার কিছু উপদেশ দিলেন। আমাদের সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করলেন। আমি, মিহিরসহ কয়েকজন আমাদের কিছু সমস্যার কথা বললাম। জনৈক একজন স্যার আমাদের অকারণে মারতেন। সব সময় বেত নিয়ে ঘুরতেন। আমরা ভয়ে ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারতাম না। ক্লাসের সময় কখন শেষ হবে তাই ভাবতাম, আর আল্লাহ আল্লাহ করতাম। হেড স্যারকে এ কথাগুলো বলেছিলাম। স্যার বিষয়টি দেখবেন বলে  আমাদের আশ্বস্ত করলেন। দুদিন পরে ক্লাসে এসে ঐ শিক্ষক বললেন, আমার বিরুদ্ধে নালিশ করা হয়, কে কে নালিশ করেছ বলো। আমরা ভয়ে কাঁপছি। এমন সময় আমাদের ক্লাসের ফরহাদ দাঁড়িয়ে আমার নামসহ মিহির ও কয়েকজনের নাম বলল। ঐ স্যার সেদিন আমাদের জোড়া বেত দিয়ে পিটালেন। আমরা ২-৩ দিন জ্বরে ক্লাসে যেতে পারিনি। পরে শুনেছি হেড স্যার ঐ স্যারকে এ নিয়ে তিরস্কার করেছিলেন। ছাত্রদের  বেত দিয়ে মারাটা মে‍াটেও পছন্দ করেননি তিনি।

আর একদিনের ঘটনার কথা আজ খুব মনে পড়ছে। স্যার স্কুল থেকে বিদায় নিয়েছেন ক’দিন আগে। আমরা তখন সহকারী প্রধান শিক্ষক মণীন্দ্রনাথ স্যারের কাছে ইংরেজি পড়ছি তার বাসায়। স্যারের বাসা ছিল স্কুল কোয়ার্টারে। বাসার সামনে অর্থাৎ তখনকার বিজ্ঞান ভবনের পিছনে কয়েকটি তাল গাছ ছিল। তখন বর্ষাকাল। সকাল বেলা কয়েকটি পাকা তাল কুড়িয়ে স্যারের বাসায় নিয়ে এসেছে স্কুল পিয়ন। স্যার তালগুলো দেখে শামসুল হক স্যারের গল্প বললেন। হেড স্যার নাকি তাল খুব পছন্দ করতেন। তাই প্রতিদিন বাজার থেকে তাল কিনতেন তিনি। একদিন স্কুলের কয়েকটি তাল পিয়ন দিয়ে মণীন্দ্রনাথ স্যার হেড স্যারের বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। স্যার তালগুলো প্রথমে রাখতে চাইলেন না। পরে রেখে দিলেন। পরেরদিন স্কুলে এসে প্রথমে প্রতিটি তাল বাবদ তখনকার বাজারদর অনুসারে দুই টাকা করে মোট আট টাকা স্কুল ফান্ডে জমা দিলেন। আর সেদিন বলেছিলেন, যদি তালগুলো তিনি না রেখে ফেরত দিতেন, তাহলে স্কুল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হত। এ গল্প বলে মণীন্দ্রনাথ স্যার সেদিন আবেগে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি বারবার বলছিলেন, এমন সৎ মানুষ আমার জীবনে দ্বিতীয়টি দেখিনি। তিনি স্কুলকে ভালবাসতেন নিজের মতন। তিনি নীতির কাছে কখনোই আপোস করেননি। এমনকি পারিবারিক কোনো বন্ধনও তাঁর নীতিকে একচুল পরিমাণ সরাতে পারেনি কখনোই। হেড স্যারের বিষয়ে তাঁর সহকর্মী রণজিৎ স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম একদিন। রণজিৎ স্যার বললেন, অন্তরে ও বাইরে একই রূপে ছিলেন তিনি। তিনি কালোকে কালো আর সাদাকে সাদা বলতেন। তিনি অকপটে দোষগুণ স্বীকার করতেন। যোগ্য শিক্ষকদের  মূল্যয়নে তিনি ছিলেন সচেতন। কখনোই চাতুকারিতা পছন্দ করতেন না। তাঁর মাঝে বিলাসিতা ছিল না। এক কথায় নির্ভেজাল সহজ সরল জীবন যাপন করতেন তিনি।

জানা যায়, দেশ স্বাধীন হবার পরের বছর স্যার প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রথমেই দধিরাম ছাত্রাবাসটিকে চালু করার ব্যবস্থা করেন। যেটি ৭১ সালে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাঁরই চেষ্টায় ও স্কুলের হিন্দু শিক্ষকদের সহযোগিতায় অল্প সময়ের মধ্যেই ছাত্রাবাসটি চালু হলে এ অঞ্চলের দূরদূরান্তের হিন্দু ছাত্ররা কে এম লতীফ স্কুলে পড়ালেখার সুযোগ পায়। কয়েক বছরের মাঝে দধিরাম ছাত্রাবাসে একটি ফুলের বাগান করেন ছাত্র ও শিক্ষকরা। যা মঠবাড়িয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছিল। যা আজ স্কুলের মার্কেট ব্যবসার মাঝে হারিয়ে গেছে। শামসুল হক স্যার স্কুলের আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতির জন্য স্কুলের জায়গায় কিছু দোকান করার উদ্যোগ নেন। তিনিই প্রথম স্কুলের সামনে (মাঠের পাশে) কয়েকটি দোকানবিশিষ্ট একতলা দালান করেন। আশির দশকের শেষের দিকে তাঁরই  পরিকল্পনায় ও চেষ্টায় থানাপাড়া থেকে দক্ষিণ বন্দরের দিকে যাবার প্রথম রাস্তা তৈরি হয়। পরবর্তীতে ঐ রাস্তার দুপাশে স্কুলের মার্কেট তৈরি করা হয়। ১৯৯৪ সাল। আমি তখন এসএসসি পরিক্ষার্থী। আমি, আমার বন্ধু আকরাম ও কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করলাম ঐ স্কুল মার্কেটের নাম শামসুল হক স্যারের নামে করব। আমরা তখনকার হেড স্যারসহ কয়েকজন স্যারকে বিষয়টি জানালাম। তাঁরা ম্যানেজিং কমিটির মিটিংয়ে বিষয়টি উঠাবেন বলে আমাদের জানালেন। তবে ওটা ও পর্যন্তই। সেটা এগোয়নি। আজ স্কুলটি শিক্ষা নিয়ে যতটা না কাজ করে, তার থেকে মার্কেট ব্যবসা নিয়ে মনে হয় বেশি কাজ করছে। আমাদের শামসুল হক স্যার কি এমন স্কুলের স্বপ্ন দেখতেন? তিনি অবসরে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত কোনো বছরই স্কুলটি যশোর বা বরিশাল বোর্ডে শীর্ষ বিশে একবারের জন্যও স্থান করতে পারেনি। আমার মনে হয় স্যার স্কুলের এমন অবস্থা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন।

যে মহান ব্যক্তি এ জনপদের শিক্ষা বিস্তারে এতটা অবদান রেখেছেন, সেই ব্যক্তি নতুন প্রজন্মের কাছে এক অচেনা মানুষ। নতুন প্রজন্ম হয়তো তাঁর নামই জানে না। তাঁর কবরটি অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে। কবরের দুপাশেই গড়ে উঠেছে মার্কেট। কবরের ভেতরে বুনো লতাপাতায় স্মৃতি চিহ্নটুকু মুছে যাওয়ার অবস্থা। স্যারকে আমরা কিছুই দিতে পারিনি । স্যারকে আমরা ভুলে গেছি। যে মানুষটি সারা জীবন আমাদের শুধু দিয়েই গেলেন, আমরা তাকে ভুলে গেলাম। আমরা কি পারতাম না স্যারের নামে একটা পাঠাগার করতে? মঠবাড়িয়ায় তাঁর নামে কি একটা রাস্তার নামকরণ করা যেত না? জিজ্ঞাসা জনপ্রতিনিধিদের কাছে। মঠবাড়িয়ার এমপি-চেয়ারম্যানরা তো স্যারেরই ছাত্র। তবে কেন নয়? আমরা কি পারি না স্কুলের দুটি প্রবেশদ্বার (মূল গেট) দুই মহান ব্যক্তি এমাদুল হক স্যার ও শামসুল হক স্যারের নামে করতে? অনেকে ভাবতে পারেন স্কুল গেটের নাম দিলে তাদেরকে ছোট করা হবে। আমি বলছি না। কারণ শামসুল হক গেট ও এমাদুল হক গেট দিয়ে নতুন প্রজন্ম আলোর পথে প্রবেশ করবে। যে আলো তাঁরা জ্বালিয়ে এসেছেন এতটা কাল। তাই এটা তাঁদের জন্য অবশ্যই সম্মানের। স্কুল কর্তৃপক্ষ কি একটু ভেবে দেখবেন? আপনাদের সবাইকে বলছি, মনে রাখবেন আপনি বা আপনারা যদি আমাদের পূর্বসূরিদের অবদানের স্বীকৃতি দেন তাহলে আপনার অবদানের কথাও আপনার উত্তরসূরিরা স্মরণ করবে। স্যার গত দুটি যুগ আমরা আপনাকে স্মরণ করিনি। যে স্কুলকে আপনি সারাটা জীবন শুধু দিয়েই গেলেন, সেই স্কুলেও আপনার মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয় না। স্যার আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন। যেভাবে আমাদের ক্ষমা করেছেন সারাটি জীবন। আমি দূর আকাশে তাকিয়ে আপনাকে খুঁজেছি অনেকদিন। রাতের দূর আকাশের ঐ উজ্জ্বল নক্ষত্রটি যে আপনি সেটা আমি জেনেছি বহু আগেই। আজ রাতে দূর আকাশের ঐ উজ্জ্বল নক্ষত্রটির দিকে তাকিয়ে ক্ষমা চাইতেই নক্ষত্রটি আরও উজ্জ্বল হয়ে আমাকে জানিয়ে দিল, আপনি আম‍াকে ও আমাদের ক্ষমা করেছেন। 

 

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ :

সাবেক প্রধান শিক্ষক মোস্তফা জামান খান

সাবেক প্রধান শিক্ষিকা রওশন আরা

শিক্ষক রণজিৎ কুমার শীল

ড. আসাদুল হক

জাহিদুল হক 

 

লেখক : প্রভাষক, সাভার ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা

 

 

Comments

comments