,

শিরোনাম :

মুক্তিযুদ্ধ এবং খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার – নুর হোসাইন মোল্লা

নূর হোসাইন মোল্লা :  ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়ে শত্রুর মোকাবেলার জন্যে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেন। এ ঘোষনার পর ৪ মে সওগাতুল আলম সগিরের নেতৃত্বে মঠবাড়িয়ায় ১১ সদস্য বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে এবং ২৫ মার্চের আগে ছুটিতে আসা সেনা সদস্যদের পরিচালনায় মঠবাড়িয়া কে.এম.লতিফ ইনিষ্টিটিউশনের খেলার মাঠ এবং গুলিসাখালী হাই-স্কুলের খেলার মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। এরপর লে. জিয়া উদ্দিন মঠবাড়িয়ায় এসে থানা থেকে অস্ত্রশস্ত্র এনে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দেন। অস্ত্র শস্ত্র রক্ষণা বেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয় সেনা সদস্য সূর্যমনির ফকর উদ্দিন মুন্সিকে। ৪ মে কর্নেল আতিক মালিক এবং ক্যাপ্টেন এজাজ আহেমেদের নেতৃত্বে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী পিরোজপুর শহর দখল করে। ৫ মে ফকর উদ্দিন বিশ্বাসঘাতকতা করে অস্ত্র শস্ত্র গুলো পুলিশের কাছে জমা দিলে মুক্তিযোদ্ধরা আত্মগোপনে চলে যান।
পিরোজপুরের মুসলিম লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী খান বাহাদুর সৈয়দ মো. আফজাল এর নেতৃত্বে ৭ মে ৪১ সদস্য বিশিষ্ট পিরোজপুর মহকুমা শান্তি কমিটি গঠিত হয়( দৈনিক আজাদ ৮ মে , ১৯৭১)। মঠবাড়িয়ার মুসলিম লীগ নেতা এম.এ জব্বার ইঞ্জিনিয়র ৮ মে খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দারকে সভাপতি, নিজেকে সিনিয়র সহ সভাপতি, আজাহার আলী মৃধা , আ. জব্বার কাঞ্চন মিয়া  ও জামায়াত-ই ইসলামীর নেতা ডা. আনিসুর রহমানকে সহ- সভাপতি , মোজাম্মেল হক কেদার মিয়াকে সেক্রেটারী, নাসির উদ্দিন মঞ্জুকে জয়েন্ট সেক্রেটারী ,শাহাদাৎ হোসেনকে অর্গানাইজিং সেক্রেটারী, মোশারেফ হোসেনকে ক্যাসিয়ার এবং আ. লতিফ অডিটরকে অফিস সেক্রেটারী করে ২১ সদস্য বিশিষ্ট মঠবাড়িয়া থানা শান্তি কমিটি গঠন করেন। অতপর ১০ টি ইউনিয়নে শান্তি কমিটি গঠিত হয় । শান্তি কমিটির  অধিকাংশ সদস্যের  উসকানি এবং নেতৃত্বে হিন্দুদের বাড়ি ঘর লুটতরাজ হয়। ১২ মে  মঠবাড়িয়ায় শান্তি কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এম.এ জব্বার ইঞ্জিনিয়ার হিন্দুদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন ।তাঁর মতে হিন্দুদের মুসলমান হতে হবে, নতুবা ভারতে যেতে হবে।খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার তাঁর বিরোধিতা করে বলেন যে, হিন্দুরা হিন্দুই থাকবে। তাদেরকে জোর করে মুসলমান করা যাবে না। এটি ইসলাম সমর্থন করে না। তিনি হিন্দুদের বাড়িঘর লুঠপাট না করার জন্য জনগণকে অনুরোধ জানান। তিনি তাঁর বাড়িতে হিন্দুদের আশ্রয় দেন। এরপর এম.এ জব্বার ইঞ্জিনিয়ার খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দারকে বাদ দিয়ে নিজেকে শান্তি কমিটির সভাপতি ঘোষণা করেন। খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার মাত্র ৫ দিন শান্তি কমিটির সভাপতি ছিলেন।এসময় তাঁর বয়স ছিল ৯৪ বছর। বার্ধক্যেও কারণে তিনি ১৯৬৫ সালে রাজনীতি থেকে বিদায় গ্রহন করেন। ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী এম.এ.জব্বার ইঞ্জিনিয়ার এম.পি.এ. নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট এম. সামসুল হকের নিকট পরাজিত হন।

শান্তি কমিটির সভাপতি এম.এ জব্বার ইঞ্জিনিয়ার ১৪ মে তুষখালী বাজারে এক জনসভায় মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং পাকিস্তানকে সমর্থন করে বক্তৃতা দেন। তিনি ফুলঝুড়ি গ্রামের হাবিলদার আ. রাজ্জাক বিশ্বাস ও নায়েক আঃ মোতালেব শরিফকে অস্ত্র জমা দিতে নির্দেশ দেন।

উল্লেখ্য, ৫ মে মুক্তিযুদ্ধ কন্ট্রোল রুম থেকে তাঁরা গোপনে ০২টি রাইফেল নিয়ে যান। এম.এ- জব্বার ইঞ্জিনিয়ারের নির্দেশে ঐ দিন বিকেলে মঠবাড়িয়া থানার এ.এস.আই .মাহবুবুর রহমান কয়েক জন পুলিশ নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার এবং আঃ রাজ্জাক বিশ্বাস ও আঃ মোতালেব শরিফকে গ্রেপ্তার ও করতে তাঁদের বাড়িতে গেলে পুলিশের সাথে তুমুল গোলাগুলি হয়। ঘটনাস্থলে আ. মোতালেব শরিফ মারা যান। গোলাগুলিতে এ.এস.আই- মাহবুবুর রহমান, দুই জন সিপাই এবং স্থানীয় চৌকিদার জবেদ আলী নিহত হন। এ ঘটনার  পর ১৫ মে ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদের নেতৃত্বে পিরোজপুর থেকে শতাধিক পাকিস্তানী সৈন্য ফুলঝুড়িতে এসে শতাধিক বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। পরের দিন পাকিস্তানী সৈন্যরা মাঝেরপুলের শরীফ বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। অতপর তারা মঠবাড়িয়া শহরের হিন্দুদের বাড়িঘর লুটতরাজ করে এবং মিঠাখালী (কাছিছিরা) গ্রামের সিকদার বাড়ি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী অবসরপ্রাপ্ত কর্পোরাল এ.বি.এম আব্দুস সামাদ এর বাড়ি পুড়িয়ে দিলে খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার ক্যাপটেন এজাজকে ঘরবাড়ি না পোড়ানোর এবং লুটতরাজ না করার জন্যে অনুরোধ করেন। কিন্তুু ক্যাপ্টেন এজাজ তাঁর কথা আমলে নেয়নি। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কবুতরখালী গ্রামে হিন্দুদের বাড়িঘর এবং গুলিসাখালী গ্রামে সওগাতুল আলম সগীরের বাড়িঘর, মমিনউদ্দিন হাওলাদারের বাড়ি, বামনা থানার হোগলপাতি গ্রামে সওগাতুল আলম সগিরের বড় ভাই  ডা. সামসুল আলমের শ্বশুর বাড়ি(আবুল হাসেম জমাদ্দারের বাড়ি),বড়মাাছুয়া গ্রামের মোল্লা বাড়ি ও ফকির বাড়িসহ অনেক ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। বহু লোক ভারতে চলে যায়।ইতোমধ্যে জামায়াত-ই ইসলমীর নেতা শরণখোলা থানার মাওলানা এ.কে.এম. ইউসুফ খুলনার খান জাহান আলী রোডের আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জামায়াত কর্মী নিয়ে রাজাকার বাহিনী  গঠন করেন । কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক আইন প্রশাসক ও গভর্ণর লে. জেনারেল টিক্কা খান ২ জুন পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স জারি করেন। এ অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ১৯৫৮ সালে গঠিত আনসার বাহিনী বিলুপ্ত করা হয় এবং এর সম্পতি , মূলধন ও দায় এবং রেকর্ড পত্র রাজাকার বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ আইনের ফলে যে কেউ রাজাকার বাহিনীতে নাম লেখাতে পাড়ত। অতিদ্রুত স্থানীয় টাউট, বাটপার, গুন্ডা, চোর, ডাকাত, মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষক, ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্য, মুসলিম লীগ এবং জামায়াত-ইসলামীর সদস্য এবং কর্মী ও শর্ষিনার পীর ভক্তরা রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি হয়। এদেরকে ২ সপ্তাহ প্রশিক্ষণ দিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয়।সরকারী কোষাগার থেকে এদেরকে বেতন-ভাতা ও রেশন দেয়া হয়। এ বাহিনী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে তাদের চলাচল অবাধ ও নির্বিঘ্নকরণ , সেতু,পুল,কালভার্ট,সড়ক,যানবাহন সহ বিভিন্ন স্থাপনার পাহরা দিত।মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলাদের গতিবিধি, অবস্থান ,চলাচলসহ যাবতীয় তথ্য শান্তি কমিটি ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে দিত।

( চলমান )

লেখক-অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।
মোবাইল- ০১৭৩০-৯৩৫৮৮৭

 

Comments

comments