,

শিরোনাম :

মুক্তিযুদ্ধ এবং খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার (৪র্থ পর্ব) – নূর হোসাইন মোল্লা

নূর হোসাইন মোল্লা :  সাপলেজা ইউনিয়নের একটি গ্রাম। এ গ্রামের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হিন্দু। তারা শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসর ছিলেন। এ গ্রামটি মঠবাড়িয়া সদর থেকে ১২ কিলোমিটার এবং এ লেখকের বাড়ি থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দক্ষিণে। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে লুটতরাজ শুরু হলে বিভিন্ন স্থানের অনেক হিন্দু এ গ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ গ্রামের প্রতাপশালী এবং ধনী ছিল বাড়ই (বিশ^াস)পরিবার। এ পরিবারের সাথে লেখকের সুসম্পর্ক ছিল এবং এখনো আছে। এ পরিবারের ৩/৪ জন ব্যক্তি লেখকের সহপাঠী। ১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে মঠবাড়িয়া থানার হিন্দুদের বাড়িঘর মুসলীম লীগের লোকেরা লুটপাট করলেও নলী গ্রামের বাড়ই বাড়ি এবং তৎসংলগ্ন হিন্দুদের বাড়িঘর লুটপাট করতে সাহস পায়নি।সাপলেজা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এবং থানা শান্তি কমিটির প্রভাবশালী সদস্য নুর হোসেন এবং শান্তি কমিটির অর্গানাইজিং সেক্রেটারী শাহাদাৎ হোসেন (এরশাদ সরকারের আমলে মঠবাড়িয়া উপজেলা পরিষদের চেয়াম্যান) এর নেতৃত্বে ৪০০-৫০০ জন মুসলিম লীগের কর্মী ও সমর্থক ২২ মে রোজ শনিবার বেলা প্রায় ১০ ঘটিকায় বাড়ই বাড়ি এবং তৎসংলগ্ন হিন্দুদের বাড়ি আক্রমন করে। তাদেরকে ঠেকানোর জন্যে বাড়ই পরিবার এবং পাড়ার প্রায় ৩০০ জন হিন্দু দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র যেমন রামদা, লাঠি, কুড়াল,বর্শা,তীর,ধনুক,ঢাল,সড়কি ইত্যাদি নিয়ে এম.এ. জব্বার ইঞ্জিনিয়ার তথা শান্তি কমিটির সমর্থকদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ ঘটনার পূর্বে যেসব হিন্দু বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন তারাও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে বাড়ই বাড়ির সম্মুখে মরণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যায়।  এম.এ.জব্বার ইঞ্জিনিয়ারের সমর্থকরা কোনঠাসা হলে নুর হোসেন চেয়ারম্যান, শাহাদাৎ হোসেন,আব্দুল গনি জমাদ্দার এবং আরো ৩/৪ জন ব্যক্তি বন্দুক দিয়ে গুলি করে ১৪ হিন্দুকে হত্যা করে। হিন্দুরা পিছু হটলে আক্রমনকারীরা বাড়ই বাড়ির ২০ টি ঘড়সহ হিন্দু পাড়ার ৭০ টি ঘড় পুড়িয়ে দেয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন নিশিকান্ত বাড়ই এবং তার পুত্র ধীরেন্দ্র নাথ বাড়ই, তার ভ্রাতা জিতেন্দ্র নাথ বাড়ই, সুরেন্দ্র নাথ বাড়ই, উপেন্দ্র নাথ বাড়ই,ও বিনোদ চন্দ্র বাড়ই, ভুপাল চন্দ্র মিস্ত্রী, নেপাল চন্দ্র মিস্ত্রী,গনেশ মিস্ত্রী, বসন্ত মিস্ত্রী, ঠাকুর চাঁদ মিস্ত্রী, সখানাথ খরাতী ও ষষ্ঠী হালদার। এ যুদ্ধে গুলি বিদ্ধ হয়ে আজও বেঁচে আছেন লেখকের সহপাঠী রমেশ চন্দ্র মিস্ত্রী। এযুদ্ধে এম.এ. জব্বার ইঞ্জিনিয়ারের সমর্থক নলী চান্দখালী গ্রামের লাল মিয়া খান নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়। খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার এ ঘটনা শুনে  গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন এবং এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে হিন্দুদের জানমাল রক্ষা করা জন্যে থানা শান্তি কমিটির সভাপতি এম.এ. জব্বার ইঞ্জিনিয়ারকে অনুরোধ জানান।

এ যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অশংগ্রহনকারী পরিমল চন্দ্র হালদার লেখককে জানান যে, নলীর ঘটনা মঠবাড়িয়ার ৩য় ট্রাজেডী। এ যুদ্ধে নুর হোসেন চেয়ারম্যান,শাহাদাৎ হোসেন, আব্দুল গনি জমাদ্দার, রুহুল আমিন দর্জি, নুরুল ইসলাম, নুরুল হক ও আরো ২/৩ জন  স্বাধীনতা বিরোধী ব্যক্তির গুলিতে ১৪ জন স্বাধীনতাকামী ব্যক্তির প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার এ মর্মান্ততিক ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন। তিনি  শান্তি কমিটির নামে অশান্তি সৃস্টিকারীদের বিপক্ষে ছিলেন। তিনি হিন্দুদেরকে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে  ভারতে প্রেরণ করতেন। এই ঘটনার পর এ গ্রামের হিন্দু যুবকরা ভারতে চলে যায়। ১৯৭২ সালের জানুয়ারী মাসে তারা দেশে ফিরে আসে। নিশি কান্ত বাড়ই এর ভাই জগদীশ  চন্দ্র বাড়ই (বিস্বাশ) ১৯ এপ্রিল মঠবাড়িয়া থানায় এম.এ. জব্বার ইঞ্জিনিয়ারসহ ২৫৯ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা, লুঠতরাজ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি উল্লেখ পূর্বক একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং জি.আর.১৮৬/৭২)। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে মামলাটি নিস্ক্রীয় হয়।( চলমান)

লেখকঃ অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এবং

সদস্য সচিব, মঠবাড়িয়া উপজেলা নাগরিক কমিটি।

মোবাঃ ০১৭৩০-৯৩৫৮৮৭

 

 

Comments

comments