,

শিরোনাম :

মুক্তিযুদ্ধে মঠবাড়িয়া : তুষখালী খাদ্যগুদাম আক্রমণ

জহিরুল ইসলাম : মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমা ছিল সুন্দরবন সাব-সেক্টরের অন্তর্গত। মার্চ মাসেই পিরোজপুর সরকারি স্কুলমাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শুরু হয়। মুক্তিযোদ্ধারা এমএনএ এনায়েত হোসেন খানকে গার্ড অব অনার জানান। তিনি ছিলেন বেসামরিক প্রধান।

তৎকালীন এ মহকুমার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের মধ্যে ছিলেন : ডা. ক্ষীতিশ ম-লি, আবদুল হাই, আ স ম সিদ্দিক, শফিজউদ্দিন আহমেদ, হেমায়েত উদ্দিন আহমেদ, ওমর ফারুক, শহীদুল আলম নীরু, আবুল কালাম মহিউদ্দিন, লুৎফুল কবির দুলাল, ওবায়দুল কবীর বাদল, নূর দিদা খালেদ রবি, ফজলুল হক ফজলু, ন্যাপ নেতা আলী হায়দর খান, নীরোদ নাগ প্রমুখ। ছাত্রইউনিয়নের ফজলু গ্রুপ ও বাদল রবি গ্রুপ পৃথক দুটো ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সুবেদার তাজুল ইসলাম ট্রেনিং প্রদানে নেতৃত্ব দেন। মহকুমা প্রশাসন মুক্তি ফৌজের সহযোগিতা করে। বিশেষ করে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মিজানুর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়ায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। সকল থানা, গঞ্জ ও অনেক গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। পিরোজপুর শহর ১ হাজার ৪০০ মুক্তিযোদ্ধার দখলে। রায়েরকাঠি জমিদার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। সকল থানার পুলিশের অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা দখল করে নেন। সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত ছিল পিরোজপুর ট্রেজারির অর্থ সুন্দরবনে স্থানান্তর করা হবে। কিন্তু ভাসানী ন্যাপের ফজলু গ্রুপের হঠকারিতার ফলে পিরোজপুর ট্রেজারি লুট হয়ে যায়। ২৬ এপ্রিল বরিশাল পতনের পর মুক্তিযোদ্দারা বিছিন্ন হয়ে পড়েন। ৫ মে পাকিস্তানি সেনারা পিরোজপুর দখল করে নেয়। পাকিস্তানি দালালেরা ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ফজলুল হক খোকনকে ধরিয়ে দেয়। তারা ফজলুল হক খোকন, বিধান চন্দ্র, সেলিম প্রমুখখে গুলি করে হত্যা করে। ছাত্রলীগ নেতা ওমর ফারুককে বরিশালে গ্রেফতার করে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা ফারুকের মাথায় বাংলাদেশের পতাকার স্ট্যান্ড বসিয়ে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলে। কিন্তু ফারুক জয় বাংলা ধ্বনি দিতে দিতে মৃত্যুবরণ করেন। বরিশাল পতনের পর লে. জিয়াউদ্দিন সহযোদ্ধাদের নিয়ে সুন্দরবনে চলে যান। জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার সুন্দরবনে আশ্রয় নেন। শরণখোলার শামসুদ্দীন, মোরেলগঞ্জের মধু, আসাদ, মঠবাড়িয়ার শহিদুল আলম বাদল, আলতাফ, মজিবুল হক খান মজনু, সুবেদার গাফফার, খলিলুর রহমান, নৌবাহিনীর নাসিরউদ্দীন, করপোরাল কবীর, বরকত প্রমুখদের নিয়ে মুক্তিবাহিনী গঠন করেন। সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে তার ক্যাম্প ছিল। প্রধান ক্যাম্প ছিল সুন্দরবনের বগীতে। জিয়াউদ্দিন মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা থানা আক্রমণ করে অস্ত্র নিয়ে নেন। সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীর দখলে থাকায় হাজার হাজার শরণার্থী ও ছাত্রযুবকদের ভারতে যেতে সুবিধা হয়। শত শত মুক্তিযোদ্ধা ভারতে ট্রেনিং ও অস্ত্র নিয়ে সুন্দরবন পথে পটুয়াখালী ও বরিশালের বিভিন্ন স্থানে যেতেন। পাকিস্তানি বাহিনী সুন্দরবন দখন করার জন্য নৌ ও বিমান হামলা চালায়। মুক্তিবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে কয়েকটি গানবোট ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পাকিস্তানি সেনারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানি বাহিনী কোনোদিন সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে সাহস পায়নি।

লে. জিয়াউদ্দিন পিরোজপুর হতে টুঙ্গিপাড়ায় গমন করেন। টুঙ্গিপাড়া থেকে তিনি সুন্দরবনে চলে আসেন। এ সময় বাগেরহাটের শামসুল আলম তালুকদার, কবীর আহমদ মধুর নেতৃত্বে মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলায় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে অবস্থান করছিলেন। তারা লে. জিয়াউদ্দিনকে পেয়ে তাকে কমান্ডার হিসেবে গ্রহণ করেন। জিয়াউদ্দিন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সুন্দরবন গমন করেন। ইতোমধ্যে পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা, বরিশাল ও বাগেরহাট মহকুমা থেকে কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধা সুন্দরবনে একত্রিত হন। জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়। ট্রেনিং ও অস্ত্র সংগ্রহ চলতে থাকে। জুলাই মাসে লে. জিয়াউদ্দিন ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ভারতে অবস্থিত নবম সেক্টর হেড কোয়ার্টারে উপস্থিত হন। তিনি নবম সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল ও জেনারেল এমএজি ওসমানীর সাথে দেখা করেন। হিরন পয়েন্ট ও মংলা পোর্টে জাহাজ আক্রমণ করার জন্য জিয়াউদ্দিন নৌ কামান্ডো চাইলেন। তাকে ৩৪ জন নৌ কমান্ডো দেয়া হয়। অস্ত্র ও ২০০ লিস্পেট মাইন নিয়ে তিনি জুলাই মাসের ২২ তারিখে সুন্দরবন যাত্রা করেন। ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, রায়ন্দা ও মাঠবাড়িয়া থানা আক্রমণ করে।

এক সময় সুন্দরবনে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের সংকট দেখা যায়। তাদের কাছে খবর ছিল, মঠবাড়িয়া থানার তুষখালী সরকারি খাদ্যগুদামে ৬ হজার মণ খাদ্য মজুদ আছে। ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দিন ও সহযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, তুষখালী খাদ্যগুদাম আক্রমণ করে মজুদ খাদ্য নিয়ে আসতে হবে। গুদামের পাহারায় ছিল রাজাকার বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা তুষখালী ও মঠবাড়িয়া আক্রমণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। জিয়াউদ্দিন, শামসুল আলম তালুকদার, শহিদুল আলম বাদল, আসাদ, হেলাল, আলী, আলতাফ প্রমুখ সিনিয়র কমান্ডার এ আক্রমণের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। কমান্ডারদের অনুরোধে ক্যাপ্টেন জিয়া আক্রমণের নেতৃত্ব থেকে বিরত থাকেন। সহঅধিনায়ক শামসুল আলম তালুকদারের নেতৃত্বে আক্রমণ পরিচালনা করা হয়। এদিকে শহীদুল আলম বাদল, আলতাফ ও সুবেদার গাফফার প্রমুখকে মঠবাড়িয়া থানা আক্রমণের দায়িত্ব দেয়া হয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল থানার পুলিশদের ব্যস্ত রাখা, যাতে তারা তুষখালীতে যেতে না পারে। তুষখালীতে সশস্ত্র রাজাকার ছিল ৩০০, মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ৮০০। চারদিক দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা রাত ৩টায় আক্রমণ করে প্রচ- গুলিবর্ষণের পর ফায়ার বন্ধ করে শামসুল আলম ও আসাদ মেগাফোনে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন। সাথে সাথে রাজাকার বাহিনী অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। ভোরে কয়েক মিনিটের মধ্যে তুষখালী দখলে আসে। গ্রামবাসীরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাগত জানায়। গুদামের খাদ্য তারা নিজেরা ট্রলার ও নৌকায় তুলে দেয়। অন্যদিকে শহীদুল আলম বাদল মঠবাড়িয়া ও তুষখালীর মাঝে অবস্থান করছিলেন। তার সাথে রাজাকারদের যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর একজন সদস্য শহীদ হন। তুষখালী দখল নবম সেক্টরের একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। পাকবাহিনী চেষ্টা করেও তুষখালী আসতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রতিহত করেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : লেখাটির তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে www.barisalpedia.net.bd ওয়েবসাইটের মুক্তিযুদ্ধে পিরোজপুর রচনা থেকে। কোনো অসঙ্গতি কারও দৃষ্টিগোচর হলে mathbariaprotidin@gmail.com এই ঠিকানায় জানালে সত্যতা যাচাইপূর্বক সংশোধন করা হবে।

 

Comments

comments