,

শিরোনাম :
«» মঠবাড়িয়ায় নির্বাচনী সংঘর্ষে ২ প্রার্থীর ৮ কর্মী আহত «» মঠবাড়িয়ায় যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার «» মঠবাড়িয়ায় দণ্ডপ্রাপ্ত সাইদীর মুক্তি চেয়ে ধানের শীষে ভোট চাওয়ায় মাইক প্রচারম্যান আটক «» মঠবাড়িয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত «» মঠবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীসহ ৬ নেতা বহিষ্কৃত «» তেলিখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. শাহাদাৎ হোসেনের ইন্তেকাল «» স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আশরাফুর রহমানের মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় «» মঠবাড়িয়ায় জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস পালিত «» ইশতেহার আসছে : অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ গড়বে আওয়ামী লীগ «» মঠবাড়িয়ায় মার্কা পেয়েই মহাজোট ও আ’লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর মিছিল

বরকতময় শবে বরাত

নূর হোসাইন মোল্লা : হিজরী সালের শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত বা সৌভাগ্য রজনী বলা হয়। মিশকাত শরীফে বর্নিত আছে যে, এ রাতে দয়াময় আল্লাহ রব্বুল আলামীনের নির্দেশে ফেরেস্তাগন মানব জাতির পরবর্তী শবে বরাত পর্যন্ত দীর্ঘ এক বছরের হিসাব নিকাশ স্থির করেন। মানব জাতির হায়াত মাউত, রিজিক-দৌলত, উত্থান-পতন, ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ, মান-সম্মান, উন্নতি-অবনতি ইত্যাদি ফেরেস্তাগন লিখেন। হাদিস শরীফে এ রাতের ফযিলত সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। পবিত্র কুরআন শরীফে সুরা আদ দুখানের ২-৪নং আয়াতে পরম করুনাময় আল্লাহ রব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন যে, “সুস্পষ্ট কিতাবের শপথ। আমি এ কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি কোন এক বরকতময় রজনীতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী ছিলাম। এ রজনীতে প্রত্যেক হিকমতময় বিষয় স্থিরকৃত হয়”। উপরিউক্ত আয়াতের অর্থ দ্বারা প্রমানিত হচ্ছে যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনকে শবে বরাতে অবতীর্ণ করেছেন। আবার সুরা আল কদরে ঘোষণা করেছেন কুরআন কদরের রাতে নাযিল করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে কোন তারিখটি সঠিক ? উত্তর হচ্ছে দুটোই সঠিক। তার মানে হচ্ছে কুরআন নাযিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে শবে বরাতে, আর সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে শবে কদরে। (মিরাজুল মুমিনীন- শায়খুল হাদিস আল্লামা কাজী মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম হাশেমী, পৃষ্ঠা-১১৯) কোন কোন তাফসীরকার বলেছেন, পবিত্র কুরআন শবে বরাতে নাযিল হয়েছে। তাদের মতে “লাইুলাতুল মুবারাকাহ” এর তাফসির করেছেন শবে বরাত। অধিকাংশ তাফসিরকারের মতে কুরআন শবে কদরে নাজিল হয়েছে। স্বয়ং পবিত্র কুরআনে “লাইলাতুল কদর” উল্লেখ আছে। এ রাতে ইবাদত-বন্দেগী করা সৌভাগ্যের বিষয়। একমাত্র শবে কদর ছাড়া এ রাতের সমতুল্য অন্য কোন রাত নেই। সুতরাং এ দু’টো রাতের ফযিলত অত্যন্ত বেশী। শবেবরাতের সম্মান ও কদর করতে হলে প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে সন্ধ্যা থেকে সারা রাত ইবাদত-বন্দেগী তথা বেশী বেশী নফল নামাজ পালন, কুরআন পাঠ, তসবীহ পাঠ, তওবা-এস্তেগফার, দোয়া-দরুদ পাঠ এবং দিনের বেলা রোজা পালন করা। তবে মনে রাখতে হবে যে, সারা রাত নফল ইবাদত করতে গিয়ে যেন ফজরের নামজ ছুটে না যায়। গরীব মিসকিনদের দান খয়রাত দেয়া এবং তাদেরকে ভোজে আপ্যায়িত করা ইবাদতের সামিল।
এতে অত্যাধিক সওয়াব হাসিল হয় এবং জাহান্নামের কঠিন আজাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আমাদের দেশে শবে কদরের চেয়ে শবে বরাতের মূল্যায়ন বেশী করা হয়। এটা ঠিক নয়। ইদানিং ইবাদতের নামে হিন্দুদের দেওয়ালী উৎসবের ন্যায় এ রাতে অসংখ্য মোমবাতি বা মশাল জ্বালিয়ে, আতশবাজী পুড়িয়ে, একে অন্যের শরীরে রং ছিটিয়ে আমোদ উৎসব করা হয়। এ উৎসব ইসলাম ধর্মের বিরোধী তথা পাপের কাজ। এ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্যে আমি সকল মুসলমানকে অনুরোধ করছি।
শবে বরাতের ফযিলত সম্পর্কে হাদিসে কুদসীসহ বিভিন্ন কিতাবে বহু বর্ণনা আছে। সম্মানিত পাঠক ও পাঠিকাগনের অবগতির জন্যে আমি কতিপয় ফযিলত বর্ণনা করছি। আশাকরি আপনারা আমল করবেন। আমল করলে আপনারা ইহকাল ও পরকালে যথেষ্ট উপকৃত হবেন।

১। হযরত আয়শা (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসুলে করীম (সঃ) বলেছেন, হে বিশ্বাসীগন। তোমরা শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রে নিদ্রা পরিত্যাগ করতঃ ইবাদত বন্দেগীতে নিমগ্ন হও এবং এ দিনে রোজা রাখ। কেননা এ রাত অত্যন্ত ফযিলত ও বরকতময়। এ রাতের ইবাদতের প্রতি তিনি খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি নিজেতো ইবাদত করতেন এবং উম্মাতদেরকে ইবাদত করতে বলতেন। তিনি কবরবাসীদের জন্য মাগফিরাত কামনা করতেন। এ রাতে পরম করুনাময় আল্লাহ রব্বুল আলামীন পৃথিবীর নিকটতম আকাশে অবস্থান করে ঘোষণা করেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ কি ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছো? আমি অবশ্যই তাকে ক্ষমা করে দেব। কেউ বিপদগ্রস্থ আছো কি? আমি বিপদ মুক্ত করে দেব। কেউ রিজিক অনুসন্ধানকারী আছো কি? আমি তাকে রিজিক দেব। (ইবনে মাজাহ)।

২। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসুলে করীম (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে নিস্কৃতি পেতে চায় সে যেন শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে পরম দয়াময় আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ইবাদত বন্দেগীতে নিমগ্ন থাকে, তাহলে দয়াময় আল্লাহ তাআলা তার জন্যে জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেবেন।

৩। হযরত আলী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, আমাদের প্রিয় নবী (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে নামাজ এবং দিনে রোজা পালন করবে, জাহান্নামের আগুন তাকে স্পর্শ করতে পারবেনা।

৪। হাদিসে বর্ণিত আছে যে, বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি ১৪ তারিখ দিবাগত রাত অর্থাৎ শবে বরাতে নিদ্রা ও অলসতা ত্যাগ করে পরম করুনাময় আল্লাহ তাআলার ইবাদত বন্দেগী করবে, তার মৃত্যুর পরও ফেরেস্তাগন রোজ কিয়ামত পর্যন্ত তার আমল নামায় সওয়াব লেখবেন।

৫। হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) কর্তৃক এক হাদিসে বর্ণিত আছে, নবী করিম (সঃ) বলেছেন, শবে বরাতে পরম করুনাময় আল্লাহ তাআলা রহমতের ৩০০ দরজা খোলা রাখেন। মাদক আসক্ত, সুদখোর, ঘুষখোর, মুসরিক, ব্যাভিচারী নিষ্ঠুর, কৃপন, যাদুকর, গনক, পিতা-মাতার অবাধ্য এবং কষ্ট প্রদানকারী, অপরের সম্পদ হরণকারী, অত্যাচারী ও ফেতনাবাজ ব্যতিত শবে বরাতে সকল ইবাদতকারীকে পরম দয়ালু আল্লাহ তাআলা মাফ করে দিবেন। তবে উক্ত ব্যক্তিরা একান্তভাবে তওবা করলে তিনি তাদেরকে মাফ করতে পারেন। কেননা পরম দয়াময় আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআন শরীফের সুরা আযযুমার ৫৩নং আয়াতে ঘোষণা করেছেন যে, হে আমার বান্দাগন। তোমরা যারা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছো, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়োনা। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করবেন সকল গুনাহ। বস্তুত তিনি পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

৬। হাদিস শরীফে বর্নিত আছে যে, হযরত রাসুলে পাক (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি শবে বরাতে ১০০বার দরুদ শরীফ পাঠ করবে রোজ কিয়ামতে তাকে সকলের আগে শাফায়াত করবেন।

৭। হাদিস শরীফে বর্নিত আছে যে, রাসুলে আকরাম (সঃ) বলেছেন, ইবাদত বন্দেগী করার নিয়তে শাবান মাসের ১৪ তারিখ সন্ধ্যাকালে যে ব্যক্তি উত্তমরূপে গোসল করবে, তার আমল নামায় সওয়াব লেখা হবে।
শবে বরাতের নামাজ
শবে বরাতের নামাজ অত্যন্ত ফযিলত ও বরকত পূর্ণ। এ নামাজ আদায় করতে হলে প্রথমে এশার ফরজ ও সুন্নাত নামাজ আদায় করে লাইলাতুল বরাত নফল নামাজের নিয়তে ২ রাকাআত করে যথাসাধ্য বেশী পরিমান নামাজ আদায় করবেন। যতবেশী আদায় করবেন তত বেশী সওয়াব আপনার আমল নামায় লেখা হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে আমরা যেমন বেশী লাভের চেষ্টা করি, তেমনি পরকালে সুখ শান্তিতে থাকার জন্যে বেশী নফল নামাজ আদায় করা উচিত।
পীরানপীর হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহঃ) এর লিখিত “গুনিয়াতুত তালিবীন” কেতাবে লাইলাতুল বরাত নফল নামাজ ১০০ রাকআতের কথা বর্ণিত আছে। এ নামাজে প্রতি রাকআতে সুরা ফাতিহা পাঠ করার পর ১০বার সুরা ইখলাস পাঠ করা হয়। কেউ কেউ সুরা ফাতিহার পর সুরা কদর এবং সুরা ইখলাস ২১,২৭,৩১,৩৩ এবং ৫০ বার পাঠ করেন। এ নামাজকে নামাজে খায়ের বলা হয়। শেষে তিন রাকআত বেতের নামাজ আদায় করতে হয়।
অধিকাংশ আলেমের মতে অধিক সংখ্যক সুরা পাঠ না করে কম সংখ্যক সুরা দ্বারা নামাজ আদায় করাই উত্তম। কারণ, হৃদয় ও মন প্রানের একাগ্রতা হচ্ছে নামাজের প্রধান অংশ। বেশী সংখ্যক সুরা পাঠ করলে নামাজের একাগ্রতা বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যে পরিমান সুরা পাঠ করা সহজ হবে, সেই পরিমান পাঠ করাই উত্তম। হাতে তসবীহ নিয়ে কিংবা হাতের কড়ায় সুরার সংখ্যা গণনা করা মাকরুহ। এ জন্যে বেশী সংখ্যায় সুরা পাঠ না করাই উত্তম।
আসুন, আমরা পরম করুনাময় আল্লাহ রব্বুল আলামীনের নিকট প্রার্থনা করি ইহকাল ও পরকালে আমাদের সুখ শান্তির জন্যে, দেশ ও জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্যে, জংগীবাদ, মাদক ও দূর্নীতি থেকে মুক্তির জন্যে।

লেখক : অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।
মোবা : ০১৭৩০৯৩৫৮৮৭

 

Comments

comments