,

শিরোনাম :

বঙ্গবন্ধু ও মহান বিজয় উৎসব

মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ : জোছনার আকাশে অসংখ্য তারার সমাবেশ থাকলেও চাঁদের মতো একটিও নেই। তেমনি বাংলা প্রান্তরে অসংখ্য মানুষ থাকলেও যুগোপযোগী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই অদ্বিতীয়। বাংলা মায়ের ঘন সবুজ কোল নিভৃত পল্লি টুঙ্গিপাড়া গ্রামে অত্যন্ত সভ্রান্ত, শান্ত কুলীন পরিবারে জন্ম নেওয়া খোকা যে একসময় সূর্যালোক ছড়িয়ে বঙ্গবন্ধুতে রূপ নেবে তা কি কেউ জানত? নিশ্চয়ই না। ¯্রােতস্বিনী মধুমতীর পলিমাটির উর্বর শক্তিসঞ্চিত শস্যদানার শক্তিতে শিশু খোকা বাল্য থেকে কিশোর-যৌবনে বহু ঘাত-প্রতিঘাত, নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে বড় হতে থাকেন। আদর্শ পিতা শেখ লুৎফর রহমানের সন্তান খোকার মধ্যে দুরন্তপনা থাকলেও আদর্শ নেতৃত্ব অর্জন করে বঙ্গবন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন। অতি অল্প সময়েই বঙ্গবন্ধু মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। যার প্রমাণ তাঁর শাহাদাৎপূর্ব বিভিন্ন সভা, সমাবেশ, মিটিং, বই, পত্র-পত্রিকার লেখালেখি। বঙ্গবন্ধু বিশ্বের সেরাসব রাজনীতিবিদের সান্নিধ্যে থেকে অর্জন করেছিলেন কীভাবে মানুষকে আপন করে অধিকার আদায় করতে হয়। কীভাবে পরাধীনতার হাত থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে হয়। আর তাই দীর্ঘ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে নিজের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পরিবার-পরিজনের কথা চিন্তা না করে জীবনের সোনালি দিনগুলো বিসর্জন দিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে সারা বাংলা চষে বেড়িয়েছেন। পশ্চিমাদের দেওয়া লোভনীয় স্বার্থ ত্যাগ করে বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য জীবনের মায়া ত্যাগ করে বীরবেশে কাজ করে গেছেন। কখনো দেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকা-ে পাকিস্তানের সাথে আপস করেননি। তিনি জানতেন কোনো একদিন লাল সূর্যটা ছিনিয়ে আনবেন। স্বাধীন বাংলার মুক্ত আকাশে স্বাধীন পতাকা পত পত করে উড়বে। বাংলার মানুষ মুক্ত বিহঙ্গের মতো অসীম শূন্যে উড়বে সেদিন আর বেশি দূরে নয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বাংলার শান্তপ্রিয় শান্ত ছেলেরা অস্ত্র হাতে শত্রুর মোকাবেলা করতে পারবে। তাদের ভয় নেই তারা প্রতিবাদ করতে পারবে। বাঙালি কখনো হারতে জানে না। মাতৃভূমির একটি কণাও তারা ছাড়বে না। দামাল ছেলেরা জীবন বিসর্জন দিয়ে হলেও মাতৃভূমিকে রক্ষা করবে।
বঙ্গবন্ধু ’৭১-পূর্ব পাকিস্তানি রাজনৈতিক কূটকৌশল খুব পরিষ্কার করে বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি আরো বুঝতে পেরেছিলেন এখনই উপযুক্ত সময়। আর তাই দেরি না করে ’৭১-এর ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসমুদ্রে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। বাংলার দামাল ছেলেরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে দীর্ঘ নয় মাস হানাদারদের সাথে যুদ্ধ করে বিজয়ের পতাকা বুকে ধারণ করেছিলেন। পাকিস্তানি শাসকদের তৈরি করা মৃত্যুকূপ থেকে উঠে আসা বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বীরবেশে মাতৃভূমিতে পা রাখলেন। বঙ্গবন্ধু বিজয়ের উৎসব রচনা করলেন। বাঙালিত্বে নতুন মাত্রা যোগ হলো মহান বিজয় দিবস বা বিজয় উৎসব। দিনটি বাঙালি জাতি বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা ঘটা করে পালন করে।
আজ ৪৭তম মহান বিজয়োৎসব। বাঙালি জাতিসত্তার প্রাণের উৎসব। এ উৎসব ছড়িয়ে দিতে হবে প্রতিটি শিশুমনে। জাতিসত্তার ওরাই তো উত্তরসূরি। মহান বিজয়োৎসব আমেজ প্রতিটা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ঘরে এখনও পৌঁছেনি। দীর্ঘ ৪৬ বছর পেরিয়ে গেছে, এখনও ভূখ-ের অনেক মানুষ বিজয়োৎসবের আমেজ থেকে বঞ্চিত। স্বাধীতার পক্ষশক্তি প্রতিটি মানুষকে আজ বুঝতে হবে যারা বিজয়কে এখনও বুঝতে শেখেনি তাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। আর ঘরে বসে থাকা নয়, বিজয় আনন্দ পেতে হলে বিজয় আনন্দ পৌঁছে দিতে হবে। শুধু শুধু কয়েকটি সংগঠন, অফিস, আদালত ঢাকঢোল পিটিয়ে শহর, উপশহর সাজিয়ে বিজয়োৎসব পালন করাই শেষ নয়। জাতির পিতা তো সকলের জন্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবদ্দশায় পরাজিত শক্তি বহু চেষ্টা করেও অমর উৎসব থামাতে পারেনি। আগামীতেও কোনো অপশক্তি এই মহান উৎসবকে দমাতে পারবে না বলে বিশ্বদরবারে স্বীকৃত ১৬ ডিসেম্বর। আমাদের বুঝতে হবে বিজয় হয়েছে বলেই তো আজ আমি আমার ঘরে স্বাধীন।  ভুলে গেলে চলবে না যাঁর জন্য বিজয়োৎসব সেই শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলার স্থাপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে বিজয়োৎসবের শুভ সূচনা শুরু হোক, এটাই হোক আমার অঙ্গীকার।

লেখক : শিক্ষক এবং সাংবাদিক, মঠবাড়িয়া।

 

Comments

comments