,

শিরোনাম :

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়া

জহিরুল ইসলাম : সময়ের বিবর্তনে দেশে তথ্যপ্রযুক্তির যেমন ব্যাপক বিকাশ লাভ ঘটেছে, তেমনি প্রয়োজনের তাগিদেই এ ব্যাপারে আইনও প্রণয়ন হয়েছে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ নম্বর ধারাটি নিয়ে বর্তমানে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। সরকারও হয়তো বুঝতে পারছে আইনটির কিছু কিছু বিষয় পুনর্বিবেচনা বা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা। সেটা হতেই পারে। প্রয়োজনের তাগিদে যে কোনো আইনই পরির্তন হতে পারে। সম্প্রতি দুজন ফেসবুক ব্যবহারকারী সংবাদপত্রে প্রকাশিত দুটি নিউজ শেয়ার করার কারণে তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ৫৭ ধারায় মামলা করা নিয়ে মঠবাড়িয়ার ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যেও এই ধারাটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকের মধ্যে এই আইন নিয়ে আতঙ্কও বিরাজ করছে। এই প্রেক্ষাপটে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের এই ধারাটি সম্পর্কে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বক্তব্য জানতে চাইলে অনেকেই তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সেখান থেকে বাছাইকৃত কিছু প্রতিক্রিয়া নিচে তুলে ধরা হলো :

ফয়সাল প্রিন্স (পিরোজপুরে জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক প্রথম আলো) : আমি মনে করি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল হওয়া প্রয়োজন। ধারাটি আমি কয়েকবার পড়েছি। ধারাটি একেবারে খারাপ তা নয়। তবে ওই ধারায় মামলাগুলো দেখে আমি হতাশ। সামান্য ব্যাপার বা আমলে না নেওয়ার মতাে বিষয়গুলো নিয়ে মামলা করা হচ্ছে। মানুষ এখন ৫৭ ধারা নিয়ে আতঙ্কে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা আমার এক বন্ধু (চঞ্চল কর্মকার নয়) ফোন করে বলল, ৫৭ ধারায় ভয়ে আছি। ফেসবুকে তোদের শেয়ার করা নিউজে লাইক দিতেও ভয় পাই। দুপুরে পিরোজপুর টাউন ক্লাবের সামনে এক সাংবাদিক বলল, ভাই আমি ফেসবুকে নিউজ পর্যন্ত শেয়ার করি না। এরকম অনেকেই ৫৭ ধারার আতঙ্কে রয়েছে। ভয়ের আরেকটি কারণ ৫৭ ধারাটি জামিনঅযোগ্য মামলা। কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গেও এ নিয়ে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, এই আইনে যা বলা আছে তা ফলো করলে প্রতিদিন হাজার হাজার মামলা নেওয়া যায়। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ধারা ভয় পাই না। ভয় থাকলে কি সাংবাদিকতা করা যায়! জেনেশুনে এ পেশায় এসেছি। প্রতিনিয়ত লিখে যাচ্ছি। কারও পক্ষে আবার কারও বিপক্ষে চলে যায় লেখা। পিরোজপুরে আওয়ামী লীগের সাংসদকে নিয়ে প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর জেলা বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা ফোনে আমাকে ধন্যবাদ জানান। তখন আমি মনে মনে বলি, কাল গালি দিবা নে। পরদিন বিএনপি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওই নেতা আমাকে ফোন করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আমাদের লেখাকে কুরুচিপূর্ণ পর্যন্ত বলতে দ্বিধা করেননি তিনি । ওই বিএনপি নেতা আমাকে প্রায়ই ফোন করে তার বাসায় একবেলা খাওয়ার জন্য দাওয়াত দিতেন। ভাগ্যিস আমি ওনার বাড়িতে দাওয়াত খাইনি। খেলে যে কী হতো? আসলে সাংবাদিকদের সৎ হতে হবে। সৎ সাংবাদিকদের কেউ কিছু করতে পারবে না।

ইসমাইল হোসেন হাওলাদার (সম্পাদক ও প্রকাশক, আলোকিত মঠবাড়িয়া) : ৫৭ ধারা মতপ্রকা‌শের স্বাধীনতা‌কে বাধাগ্রস্ত কর‌ছে। এ‌টি এক‌টি বিত‌র্কিত অাইন। এই অাইন স্বাধীন সাংবা‌দিক‌দের জন্য হুম‌কি স্বরুপ। এই অাইন অন‌তি‌বিল‌ম্বে বা‌তিল কর‌তে হ‌বে।

জুনাইদ মহসিন অনি : অভিশপ্ত একটি ধারা। সাংবাদিক নির্যাতন করার সহজ একটি হাতিয়ার। তাই এই কালো অাইন অবিলম্বে বাতিল চাই।

রাশেদ রায়হান (ছাত্র) : তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে ৫৭ ধারায় যা বর্ণনা করা আছে তা প্রবহমান রাখা যাবে, তবে কিছু সংশোধন সাপেক্ষ।
১. এটি জামিনযোগ্য হতে হবে।
২. এ আইনে অনেক ব্যাপার সংযুক্ত থাকায় সকল বক্তব্য স্পষ্ট হতে হবে। (কেননা অস্পষ্ট আইনে অনেক হয়রানির সুযোগ থাকে)
৩. এ আইনকে অআমলযোগ্য করতে হবে যাতে করে পুলিশ আদালতের আদেশ ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করতে না পারে।
৪. ৫৭ ধারার উপধারা ১-এ বর্নিত “রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়” এ অংশ বাদ দিতে হবে। কারণ দেশটা এখনও মগের মুল্লুক হয়নি যে সরকার বা কোনো ব্যাক্তি কোনো অন্যায় করলে তা তুলে ধরা যাবে না।
৫. সাজা আর অর্থদণ্ড কমাতে হবে। এ আইনে যা দণ্ড বর্ণিত তা বলতে গেলে কোনো গুরুতর মামলায়ও নেই। (সর্বনিম্ন ৭ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১৪ বছর ও ১ কোটি টাকা)

সাইফুল বাতেন টিটো : বাকস্বাধীনতার খুন পিয়াসী ছুরি। যা এই সকরারের জন্যও কাল হয়ে দাঁড়াবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ কোনো দেশের জন্যই মঙ্গল বয়ে আনেনি।

সাইফুর রহমান শিশির (নিউজরুম এডিটর, ইংলিশ ডেস্ক, বৈশাখী টেলিভিশন) : প্রযুক্তি আইনের সাতান্ন ধারা একটা কালাকানুন যা সম্পূর্ণভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ৩৯ ধারায় প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের এবং বাক বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। আর তথ্যপ্রযুক্তি আআইনের ৫৭ ধারায় নাগরিকের সেই সাংবিধানিক অধিকার স্পষ্টতই খাটো বা রহিত করা হয়েছে। এ রকম সাংবিধানিক জটিলতা বা সংসদীয় গণতন্ত্রের শিষ্টাচার-বহির্ভূত আচরণ আমরা আরও দেখতে পাই ফ্লোর ক্রসিং বা দলের বিপক্ষে কোনো সংসদ সদস্যের ভোট দেওয়া এবং দিলে নামাজ এক ওয়াক্ত ইচ্ছাকৃত কাজা হলে সাথে সাথে কাফের হয়ে যাওয়ার মতো সংসদ সদস্যপদ খারিজ হওয়ার ধারা। এমনকি ভবিষ্যতে অন্য কোনো দল বা স্বতন্ত্রভাবেও নির্বাচনে ওই ব্যক্তি প্রার্থী হতে পারবেন না। এই ৭০ ধারা সংসদ সদস্যের গণতান্ত্রিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করে, যা প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রে চরম অশোভনীয়।

শহীদুল ইসলাম (প্রবাসী) : গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনতা হরণ ও দেশ, জাতির জন্য কালাকানুন। যে দেশে করাপশন ও ক্রাইম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে সে দেশের জন্য এমন একটি অভিশপ্ত আইন সত্যিই হতাশাজনক। এমন আইন বলবৎ থাকলে গণমধ্যমকর্মীদের কলম শিথিল হবে ও সর্বস্তরে অন্যায়-অবিচার বৃদ্ধি পাবে। সময়ের প্রয়োজনে ৫৭ ধারা কালাকানুন বাতিলের দাবি রাখে।

মেহেদী হাসান (পিরোজপুর জেলা প্রতনিধি, দৈনিক খোলা কাগজ) : ৫৭ ধারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বাকরুদ্ধ করে। এটি সাংবাদিকের কলমকে থামিয়ে দিতে এক ধরনের হাতিয়ার। তাই এই আইনকে বিবেচনা করে সংশোধন করা উচিত।

গোলাম মোস্তফা (মানব সম্পদ কর্মকর্তা, মাছরাঙা টেলিভিশন) : এটি বিরোধী মতকে দমনের হাতিয়ার। সরকারে যে যাবে সে-ই এটা টিকিয়ে রাখবে। তবে শক্ত বিরোধী দল থাকলে এবং যদি ব্যাপক আন্দোলন করা যায়, তবেই হয়তো সম্ভব। সাংবাদিকদের কয়েক ভাগে বিভক্তও এর একটি বড় কারণ। বৃহত্তর স্বার্থে সাংবাদিকদের ঐক্য থাকলেও অনেক বিচার পাওয়া যেত। যেমন সাগর রুনি।

সবুজ রাসেল : ৫৭ ধারা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত এই ধারা নিয়ে মন্তব্য করে বিপদে পড়তে চাই না।

মিজানুর রহমান : একটি কালো আইন।

মল্লিক রুম্মান : আইনটির দরকার আছে তবে সংশোধন অতীব জরুরি।তা না হলে এর সঠিক ফল হবে না।

নুরুল আমিন রাসেল (যুবলীগ নেতা, মঠবাড়িয়া) : আমি কি মন্তব্য করব? আমি ৫৭ ধারার ভেতরেই আছি, তাও আবার ১নং।

জিল্লুর রহমান (সাধারণ সম্পাদক, মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব) : বাতিল করতে হবে ৫৭ ধারা। নইলে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না।

আবদুল্লাহ আল রাফিন : ৫৭ ধারা ৭১-এর চেতনার পরিপন্থী। এটির দ্বারা আবারও মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। এটির মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল এক দৃষ্টান্ত।

আনোয়ার সাদাত সবুজ (মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক খোলা কাগজ) : এটা কোনো আইনই নয়। হাইকোর্টে রিট করলে এটা টিকবে না। এটা শুধু কালো আইন না, এটা হলো হলুদ আইন। আমার এই মন্তব্যের জন্য আমার বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ হতে পারে।

মোঃ দেলোয়ার : ৫৭ধারা ব্যক্তির স্বতন্ত্র বজায় রাখার আইন। পিছনে মিথ্যা বানোয়াট অবাস্তব, মানুষকে হেয় করা থেকে বিরত ও আইনি সাহস যোগায়। এ আইন চালু থাকাসহ আরও কঠোর ও সবল ফৌজদারি কোর্টে গ্রহণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

সর্বশেষ খবর : জাগো নিউজ টুয়েন্টি ফোর ডটকম সূত্রে জানা গেছে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারা বাতিল করা হবে কি না আইন মন্ত্রণালয়ের এক পর্যালোচনা সভায় এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে। আজ রোববার বেলা ১১টায় ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে এ সভা ডাকা হয়েছে। এ সভায় ৫৭ ধারা নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জানা গেছে। তবে মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন হলে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা থাকবে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাই অবস্থায় রয়েছে।

এর আগে গত ১৬ মে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৬-এর খসড়া নিয়ে মতবিনিময় সভা হয়। আজ ওই মতবিনিময়ের পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।

২০০৬ সালে আইসিটি আইন হলেও ২০১৩ সালে তা সংশোধন করা হয়। এই আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক।

 

0Shares

Comments

comments