,

শিরোনাম :
«» মঠবাড়িয়ায় নির্বাচনী সংঘর্ষে ২ প্রার্থীর ৮ কর্মী আহত «» মঠবাড়িয়ায় যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার «» মঠবাড়িয়ায় দণ্ডপ্রাপ্ত সাইদীর মুক্তি চেয়ে ধানের শীষে ভোট চাওয়ায় মাইক প্রচারম্যান আটক «» মঠবাড়িয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত «» মঠবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীসহ ৬ নেতা বহিষ্কৃত «» তেলিখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. শাহাদাৎ হোসেনের ইন্তেকাল «» স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আশরাফুর রহমানের মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় «» মঠবাড়িয়ায় জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস পালিত «» ইশতেহার আসছে : অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ গড়বে আওয়ামী লীগ «» মঠবাড়িয়ায় মার্কা পেয়েই মহাজোট ও আ’লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর মিছিল

কিশোর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস : কুয়াশা ঢাকা দিন

জহিরুল ইসলাম  :

পর্ব-১

অনেকটা হন্তদন্ত হয়েই ক্লাসে ঢুকলো রবিন। মেইন গেট পেরুনোর আগেই ঘণ্টা পড়ে গেছে। রবিনের আগেই স্যার যদি ক্লাসে ঢুকে পড়েন তাহলে আজ আবার ভাগ্যে কী জোটে কে জানে? এমনিতেই লেট-লতিফ হিসেবে কিছুটা নাম কামিয়েছে রবিন। বাংলা স্যার তো সেদিন বলেই বসলেন, তোমার নাম আবদুল লতিফ না রেখে ভুল করেছেন তোমার বাবা-মা।

শুনে তো ক্লাস জুড়ে সে কী হাসাহাসি! এর মধ্যে আবার একটা ফাজিল টাইপের ছেলে বলে উঠলো, কেন স্যার, রবিনের নাম কেন লতিফ রাখা উচিত ছিলো?

স্যার বললেন, তাহলে লেট লতিফ নামটা ওর সার্থক হতো।

স্যার তো বলেই খালাস, তাঁর তো আর দুনিয়ার সব কাজ সামাল দিয়ে তারপর স্কুলে আসতে হয় না! এইতো কিছুদিন আগের একটি ঘটনা। সেদিন সকাল হতে না হতেই মা ডেকে তুললেন-বাবা রবিন, হোমওয়ার্ক শেষ না করেই রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিস। তাড়াতাড়ি উঠে হোমওয়ার্ক শেষ করে নাশতা খেয়ে রেডি হয়ে নে। স্কুলের সময় হয়ে এলো বলে।

আরও কিছুটা সময় ঘুমানোর ইচ্ছা থাকলেও পারলো না রবিন। কারণ অঙ্ক স্যারের হাতে বেতের লকলকে ডগাটা ওর বন্ধ চোখের সামনে ভাসছে তখন। তাই ঘুমজড়ানো চোখে উঠে বসতে হলো। উঠে হাত মুখ ধুয়ে যেই না হোমওয়ার্ক করতে বসেছে পড়ার টেবিলে, অমনি পাশের জানালার ফাঁক থেকে একটা পেয়ারা বাতাসে দুলে দুলে ডাকতে লাগলো-আয় রবিন, তাড়াতাড়ি আয়। ইমনের চোখে পড়লে কিন্তু আর রক্ষা নেই। টুপ করে পেড়ে নিয়ে ঝুপ করে লাফিয়ে পড়বে পুকুরের পানিতে। তারপর জলের মধ্যে সাঁতার কাটবে আর রবিনকে দেখিয়ে দেখিয়ে খাবে ডাঁশা পেয়ারাটা।

না, আর দেরি করা যায় না। কোনোমতে হোমওয়ার্কের খাতা দুটো লেখা শেষ করে একটা গামছা কোমরে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে পুকুরপাড়ের দিকে দৌড় দেয় রবিন। গাছ থেকে পেয়ারাটা পেড়ে পেয়ারাগাছের ডাল থেকেই ঝপাত্ করে লাফিয়ে পড়ে পুকুরের জলে। তারপর পাড়ার অন্য ছেলেদের সঙ্গে সাঁতার কাটতে কাটতে চোখ দুটো টিয়াপাখির মতো লাল টুকটুকে বানিয়ে ঘরে ফেরে রবিন। দেরি হয়ে গেছে আন্দাজ করতে পেরে মাথা খারাপ হয়ে যায় তার। সাড়ে নটা বেজে গেছে। আবারও সেই লেট-লতিফ!

কাল অবশ্য সেরকম কিছু ঘটেনি। রাতে পালিয়ে পালিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘুম প্রায় হয়নি বললেই চলে।

রাতে বাবার রুম থেকে ট্রানজিস্টর রেডিওটা চুরি করে নিজের কাছে এনে রেখেছিলো রবিন। পুকুরপাড়ের চালতাগাছতলায় গিয়ে সেটা নিয়ে এতো চেষ্টা করেও সেন্টারটা ধরতে পারলো না সে। মাঝরাতে ঘুমে চোখ দুটো কেবল বুজে এসেছে তখনই গুড়ুম করে একটা শব্দ হলো কোথাও। শালা রাজাকারের বাচ্চা রাজাকার বলে গালি দিতে দিতে আবারও ঘুমানোর চেষ্টা করে ও। কিন্তু চোখ বুজলেই ওদের পড়শী কেদার চাচার মুখটা ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে। মুখটা প্রথম প্রথম স্বাভাবিক মনে হলেও আস্তে আস্তে সেটা বিকট আকার ধারণ করতে থাকে। রাজাকার শব্দটা মনে এলেই রবিনের চোখে কেন যে কেদার চাচার মুখটা ভেসে ওঠে সেটা নিয়ে অনেক ভেবেছে ও। আসলে রাজাকার বাহিনীতে যারা নাম লিখিয়েছে তাদের মধ্যে কেদার মিয়াই ওর পরিচিত। তাই ওর কাছে রাজাকার মানেই কেদার চাচা। তো এসব ভাবতে ভাবতে রবিন যখন ঘুমায় তখন প্রায় ভোররাত। সকালে ঘুম থেকে সময়মতো উঠতে না পারলে ক্লাসে তো দেরি হবেই।

ক্লাসের সামনে গিয়ে হাঁফ ছাড়লো রবিন। যাক, আজকের মতো বাঁচা গেছে, স্যার এখনও আসেননি!

ক্লাসে ঢুকতেই পেছনের দিকের একটা বেঞ্চি থেকে শিশিরের আমন্ত্রণ পেলো রবিন। ইশারায় রবিনকে সে তার পাশে বসতে বললো। রবিনও কাউকে কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে আস্তে গিয়ে শিশিরের পাশে বসে পড়লো।

এই রবিন, শুনেছিস? রবিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো শিশির।

কী?

আবার পালিয়েছে।

কে?

ক্লাস টেন এ-সেকশনের  মোস্তফা।

ওই যে ফার্স্টবয় মোস্তফা?

হ্যাঁ।

মোস্তফা এতো ভালো ছাত্র হয়েও যুদ্ধে গেল?

হ্যাঁ গেল। কেন, যুদ্ধে যাওয়ার সঙ্গে ভালো ছাত্র মন্দ ছাত্রের সম্পর্ক কী? জিজ্ঞেস করলো শিশির।

না, মানে যুদ্ধটা তো একটা বাজে ব্যাপার। ওটা আমার মতো মন্দ ছাত্রদের কাজ।

কেন, গত বছর যশোর বোর্ডে ফার্স্ট প্লেস পেয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন যে গণপতিদা, তিনিও তো পালিয়েছেন। শোন রবিন, তুই কি কিছু ভাবছিস?

আচ্ছা, স্যার এখনও ক্লাসে আসছেন না কেন? পণ্ডিত স্যার তো কোনোদিন ক্লাসে দেরিতে আসেন না! কথা ঘোরাতে চাইলো রবিন।

শিশির বললো, মোস্তফা ভাইয়ের ব্যাপারটা নিয়ে স্যাররা আলোচনা করছেন। আজ হয়তো হেডস্যার সব ক্লাসের ছাত্রদের ডেকে একটা বক্তৃতা শোনাবেন। বলবেন, বদমাশ ছেলেটা পালিয়েছে। তোমরা হয়তো শুনে থাকবে ব্যাপারটা। কিন্তু তোমরা তো জানো ওই ছেলেটা এর আগেও অনেকবার পালিয়েছে বাড়ি থেকে। টাকা পয়সা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আবার ফিরে এসেছে। আমার প্রিয় ছাত্ররা, কোনো ভালো ছেলে বাড়ি থেকে পালায় না। কোনো ভালো ছেলে তার বাবা-মা এবং শিক্ষকদের কষ্ট দেয় না।

ক্যান, হেডস্যারও কি ওই দলের নাকি? পণ্ডিত স্যারকে নাকি স্কুলে আসতে নিষেধ করেছেন? পণ্ডিত স্যার নাকি ভারতের দালাল?

আরে ওটা তো স্যারের কথা না, ডিসি সাহেবের কথা।

তাহলে পণ্ডিত স্যার এখন কোথায় যাবেন? ইন্ডিয়া চলে যাবেন?

আরে না, স্যারও নাকি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রাণ থাকতে তিনি এ দেশ তো ছাড়বেনই না, স্কুলও ছাড়বেন না। বললো শিশির।

এই শিশির, স্যার আসছেন বোধহয়। ঠোঁটের কাছে একটা আঙুল তুলে চুপ করতে ইশারা করলো রবিন।

তারপরও শিশির ফিসফিসিয়ে বললো, শোন, স্কুল ছুটির পরে তোর সাথে আরও কথা আছে। স্কুলের পেছনের বাগানে অপেক্ষা করবো আমি। তুই চুপি চুপি চলে আসিস।

শিশিরের কথা শেষ হওয়ার আগেই ক্লাসে ঢুকলেন পণ্ডিত স্যার। ওরা যেমন ধারণা করেছিলো তেমন কোনো উপদেশমূলক বক্তৃতা-টক্তৃতা হলো না ক্লাসে। পণ্ডিত স্যার বাংলা পড়ালেও আজ তিনি কী মনে করে ছাত্রদের ভূগোলের জ্ঞান দিলেন কিছুক্ষণ। ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের ম্যাপ দেখালেন। আরও দেখালেন পূর্ব পাকিস্তানের তিনদিকের ভারতের সীমান্ত। পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝখানে কতটা দূরত্ব তাও এঁকে দেখালেন। বাংলার ক্লাসে বাংলার ব-ও উচ্চারণ না করে ‘আমার ছাত্ররা সবাই ভালো থেকো’ বলে চলে গেলেন তিনি।

স্যার চলে গেলে ছাত্ররা বলাবলি করতে লাগলো, স্যারের কি আজ মাথা খারাপ হয়েছে? কোথায় তিনি ণত্ব-বিধি আর ষত্ব-বিধি শেখাবেন তা না, তিনি পুরো পূর্ব পশ্চিম পাকিস্তান দেখিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।

 

পর্ব-২

রবিনদের স্কুলের পেছন দিকটায় ঘোষেদের বিশাল বাগান। বাগানের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বলেশ্বরের শাখা নদী। নামে নদী হলেও এটি আসলে একটি খালের মতোই। খালটির দুপাড়কে জোড়া লাগিয়েছে বড় একটি লোহার ব্রিজ। ব্রিজের একদিকে নৌকাঘাট। অন্যদিকে স্কুল।

ঘাটে তখন বেশ কয়েকটি কেরায়া নৌকা বাঁধা। মাঝিরা কেউ খালে নাইতে নেমেছে। কেউবা ছোট্ট মাটির চুলায় করে দুপুরের খাবার রান্না করছে। একজন ছইয়ের মধ্যে বসে বসে কুড়ুত্ কুড়ুত্ শব্দ করে হুঁকো টানছে।

স্কুল ছুটির পর শিশির এসে বসেছে স্কুলের পেছনের বাগানের ঠিক খালের পাড়টায়। তার কাছাকাছি খালের দুপারে খেলছে অনেকগুলো বাচ্চা ছেলে। দুটো দলে ভাগ হয়েছে তারা। ভাগ হয়ে খালের দুই পারে অবস্থান নিয়েছে দুই দল। দুই দলের সবার মধ্যেই যুদ্ধের সাজ। গাছের ছোট ছোট ডাল, মাটির ঢেলা, এক ধরনের ছোট ছোট বুনো ফল-এসবই অস্ত্র দুদলের। বাঁশের কঞ্চি কেটে চমত্কার এক অস্ত্র বানিয়েছে ওরা। তার মধ্যে ছোট্ট এক ধরনের বুনো ফল ভরে অন্য একটা লাঠি দিয়ে বিশেষ কায়দায় ছুড়ে মারা হয় ফলগুলো। একদলের যুদ্ধজাহাজ একটা তালগাছের ডোঙ্গা নৌকা। অন্যদলের কলাগাছের ভেলা। একদল অন্যদলকে আক্রমণ করতে যাচ্ছে ডোঙ্গা নৌকায় অথবা ভেলায় চড়ে। বিপক্ষ দল তখন তাদেরকে ফিরানোর জন্য নিজেদের সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র প্রয়োগ করছে। মজার ব্যাপার হলো-দুদলই দুদলকে পশ্চিম পাকিস্তানি বলে আক্রমণ করছে।

এইমাত্র এপারের দলটি হামলা চালিয়ে ওপার থেকে একটি বাচ্চা ছেলেকে ধরে এনেছে। ধরে এনে মিছেমিছি তাকে মারছে আর বলছে, পশ্চিমা সৈন্য ধরে এনেছি, মার, সবাই মিলে ওকে মার। অন্যদিকে বন্দি ছেলেটি বলছে, আমি পশ্চিমা না, আমি বাঙালি। দেশের জন্য যুদ্ধ করছি আমি। মরে গেলেও তোদের মতো পশ্চিমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবো না। এ দেশ আমরা স্বাধীন করবোই। এই বলে ছেলেটি একদলা থুতু ছিটিয়ে দেয় মাটিতে।

শিশির বসে ছিলো খালের পাড়ে একটা গাছের গুঁড়ির ওপর।

কাছে কোথাও একটা ঘুঘু তখন একটানা ডেকে চলছিলো। দখিনা বাতাসে গাছের পাতারা থরথর করে কাঁপছিলো। একটা মাছরাঙা পাখি খালের পাড়ে ছোট্ট একটা গাছের ডালে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পানির দিকে। মাছের দেখা পেলেই পানিতে ঠোকর দিয়ে ঠোঁটে তুলে আনবে মাছ।

রবিন এলো ঠিক চল্লিশ মিনিট পর। এসেই বললো, স্যরি দোস্ত, দেরি হয়ে গেলো। আমি মনে করলাম তুই আবার অপেক্ষা টপেক্ষা করে চলে গেলি কি না।

শিশির বললো, না রে, তোর অর্থনীতি ক্লাসটার কথা আমার জানা ছিলো। আমার অর্থনীতি নেই বলে এক ঘণ্টা আগেই ছুটি পেয়ে গেলাম।

কী করছিলি এতোক্ষণ বসে বসে?

যুদ্ধ দেখছিলাম।

মানে!

খালের দুপারে বাচ্চাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলো শিশির। ওই যে দেখ, দুদলের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। একদল আরেক দলকে প্রাণপণ আক্রমণ করছে। জীবন বাজি রেখে সে আক্রমণ প্রতিরোধ করছে অন্যদল।

ওদের কথার মাঝখানেই দূর থেকে বিকট একটা শব্দ ওদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেটা ওদেরকে অতিক্রম করে দূরে কোথাও মিলিয়ে যায়।

ওই যে যাচ্ছে, পশ্চিমা দালালের বাচ্চা সব। ছুটন্ত স্পিডবোটের দিকে ইশারা করে বললো শিশির।

হ্যাঁ, থানায় যাচ্ছে। কোথাও মুক্তির খোঁজটোজ করতে গিয়েছিলো হয়তো। মুক্তি মানে বোঝো তো?

হ্যাঁ, বুঝবো না কেন, মুক্তিবাহিনীর লোকদের ওরা মুক্তি বলে ডাকে। শোন যেজন্য ডেকেছিলাম।

হ্যাঁ বল।

তুই কি কিছু ভেবেছিস?

কী ভাববো বল তো?

ওই যে পণ্ডিত স্যার যে ইঙ্গিত দিলেন।

কই স্যার তো কোনো ইঙ্গিত টিঙ্গিত দেননি।

দিয়েছেন। নইলে বাংলার ক্লাসে হঠাত্ করেই পণ্ডিত স্যার ভূগোল পড়াতে গেলেন কেন?

আমি পিছনের বেঞ্চের ছাত্র। স্যারদের নিয়ে অতশত চিন্তা আমার নেই। ওসব করবে তোর মতো ভালো ছাত্ররা। বললো রবিন।

শিশির বললো, শোন দোস্ত, তুই তো জানিস, সুন্দরবনে মুক্তিবাহিনী আশ্রয় নিয়েছে। আমরা যদি কেউ পালিয়ে যাই তাহলে যাতে পথ ভুল না করি সেজন্যই স্যার আমাদেরকে ম্যাপ এঁকে পথঘাট চিনিয়ে দিলেন।

শিশিরের কথা শুনে এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলো রবিন। তারপর বললো, শিশির, আমি যা করবো তা মনে মনে আগেই ঠিক করে রেখেছি। তবে তুই এসব নিয়ে মাথা ঘামাস নে। বাড়ি গিয়ে লেখাপড়া কর। সামনে পরীক্ষা, তোকে ফার্স্ট হতে হবে না!

না রে, দেশের এই অবস্থায় কেউই নিজেকে নিয়ে আর ভাবছে না। সবাই দেশ নিয়ে চিন্তা করছে। দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তা করছে। সবার মাথায় একটাই চিন্তা-কীভাবে ঢাকায় ছাত্রদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। রাজারবাগ পুলিশলাইনে কী নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়েছে। কীভাবে হত্যা করা হয়েছে নিরীহ মানুষদের। শোন, আমি জানি এ অবস্থায় তুই নিশ্চয় বসে থাকবি না। তাই তোকে এখানে ডেকে এনেছি। এখন থেকে আমরা যা করবো দুজনে একসঙ্গেই করবো।

পালাবি? জিজ্ঞেস করেই সোজা শিশিরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে রবিন। শিশিরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো রবিনের চোখের দিকে। তারপর ডান হাত বাড়িয়ে দিলো। রবিন ডান হাত দিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করে ধরলো শিশিরের হাত। ছোট্ট সে মুষ্টিতে কী ভয়ঙ্কর তেজ তা টের পেলো শুধু শিশিরই।

হাত ছাড়িয়ে নিয়ে শিশির বললো, এই রবিন, তোর গুলতিটা কই? তুই তো রোজই গুলতি নিয়ে এই বাগানে পাখি শিকার করে বেড়াস। চল আমরা পাখি শিকার করে হাত সই করি।

নারে দোস্ত, তুই আসলে আমাকে ভুল বুঝেছিস। আমি গুলতি হাতে নিয়ে এই বাগানে ঘুরে বেড়াই ঠিকই, তবে সেটা পাখি শিকার করার জন্য নয়, দুষ্ট ছেলেদের হাত থেকে পাখিদের বাঁচাতে। দুষ্ট ছেলেরা পাখির বাসা ভেঙে ফেলে, বাসা থেকে ডিম পেড়ে নেয়, বাচ্চা পাখিদের ধরে নিয়ে খাঁচায় আটকে রাখে। এইসব দুষ্ট ছেলেকে ভয় দেখানোর জন্যই গুলতিটা হাতে রাখি আমি। পাখি আছে বলেই তো এই বন, এই গাছপালা এতো ভালো লাগে। তাই না শিশির!

হ্যাঁ তাই। চল তাহলে, আজ বাসায় ফিরে যাই।

হ্যাঁ চল।

 

পর্ব-৩

ওই রাতেই রূপনগর থানায় দুটো ঘটনা ঘটলো। সন্ধ্যারাতে স্থানীয় কিছু যুবক থানা আক্রমণ করলো। ব্যাপারটা ছিলো প্রচণ্ড দুঃসাহসী। থানায় তখন দশজন পুলিশ ছিলো। আর ছিলো দশটি রাইফেল। দশ-বারোজন যুবক থানার চারদিক ঘেরাও করে ফেললো। তাদের হাতে কোনো অস্ত্রশস্ত্র ছিলো না। যুবকরা থানা ঘেরাও করে সব পুলিশকে অস্ত্র ফেলে দিতে বললো। ছোট হ্যান্ডমাইকে দলনেতা ঘোষণা দিলো-থানার সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র যেনো থানার সামনের খালি জায়গাটিতে ছুঁড়ে ফেলা হয়। নইলে চারদিক থেকে বোমা নিক্ষেপ করা হবে বলে চিত্কার করে জানালো সে। ভয় পেয়ে পুলিশের সবাই যার যার হাতের রাইফেল থানার সামনে ছুঁড়ে মারলো। তখন এক কিশোর দৌড়ে গিয়ে সেগুলো যুবকদের হাতে হাতে তুলে দিলো। সেই অস্ত্র দিয়েই থানার লোকজনকে ভয় দেখিয়ে চলে এলো তারা।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটলো শেষরাতের দিকে।

অস্ত্র লুট হওয়ার পর রূপনগর থানা পুলিশ অয়্যারলেসে সে খবর জানায় জেলা পুলিশকে। খবর পেয়ে আশপাশের তিনটি থানা থেকে অতিরিক্ত ফোর্স এসে সম্ভাব্য সব জায়গায় সারারাত তল্লাশি চালায়। শেষরাতের দিকে একটি বাড়ি থেকে বারো জনকে আটক করা হয়। রাইফেলগুলোতে কোনো গুলি না থাকায় যুবকরা কোনো প্রতিরোধ করতে পারেনি। ধরা পড়া বারো জনের মধ্যে একজন হলো শিশির।

এর পরের ঘটনা আরও লোমহর্ষক।

শিশিরসহ বারো জনকে থানায় এনে একটি রুমের মধ্যে আটকে রাখা হয়। সকাল হলে তাদের কী পরিণতি হবে সে কথা সবারই জানা ছিলো। তাই পালানোর পথ খুঁজতে থাকে সবাই।

তখনও সকাল হয়নি।

ভোরের আলো ফুটে উঠছিলো পুব আকাশ থেকে। পাশের কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসছিলো মোরগের ডাক। থানার পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো স্থানীয় জামে মসজিদের মোয়াজ্জিন। ফজরের আজান দিতে হবে। এখনই। বলেশ্বরের শাখা নদীটি কুলু কুলু শব্দে বয়ে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের দিকে।

হঠাত্ ঝপাত্ ঝপাত্ শব্দে অস্থির হয়ে উঠলো সেই পানি। থানার প্রহরীরা যখন টের পেলো জানালা ভেঙে পালিয়েছে যুবকরা তখন অবশ্য অনেক দেরি হয়ে গেছে। নাকি প্রহরীরা ইচ্ছে করেই ওদেরকে পালাবার সুযোগ দিয়েছিলো কে জানে? কারণ তারাও তো বাঙালি। অন্য এক বাঙালি মায়ের সন্তানের রক্তে লাল হবে বলেশ্বরের পানি তা হয়তো চায়নি থানার বাঙালি প্রহরীরা।

তারপরও পুরো থানা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো নদীর দিকে। রাইফেলের গুলির শব্দে কেঁপে উঠলো পুরো এলাকা। কিন্তু একজনকেও আটকে রাখা গেলো না।

থানার জানালা গলে প্রথম বাইরে বেরিয়েছিলো শিশির। ও ছোট বলে ওকেই সবাই আগে পালাবার সুযোগ দিতে চাইলো। কিন্তু বাইরে বেরিয়েও একা একা পালালো না শিশির। সবাই বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলো। তারপর সবাই মিলে একসাথে ঝঁপিয়ে পড়লো পানিতে।

পানিতে পড়ে সবাই ভাটির দিকে শরীর ছেড়ে দিলেও শিশির চলে গেল উজানে। উজানে যাওয়ার অবশ্য কারণও আছে। থানার ঘাট থেকে কিছুটা উজানে গেলেই খালের পাড়ে শিশিরদের বাসা।

 

পর্ব-৪

পরদিন স্কুল পালালো রবিন। বাসা থেকে বই খাতা নিয়ে বের হলেও ক্লাসে যেতে ইচ্ছে করলো না তার।

প্রথমে ঘোষেদের বাগানে গিয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। মনে মনে আশা করেছিলো আজ হয়তো ক্লাসের আগেই শিশির এখানে আসবে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য।

কিন্তু না, শিশির এলো না।

ক্লাস শুরু হওয়ার আগে আগেই বাগানের পিছনের রাস্তা দিয়ে পালালো রবিন। স্কুলের বই খাতা রেখে দিলো একটা ঝোপের মধ্যে। স্কুলের সময় বই খাতা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ালে লোকজন হয়তো সন্দেহ করবে। ভাববে ছেলেটা নিশ্চয় স্কুল পালিয়েছে।

বাগান পেরিয়েই একটি মাটির রাস্তা। রাস্তাটি গ্রামের দিক থেকে এসে ডানদিকে বেঁকে স্কুলের সামনে দিয়ে চলে গেছে বাজারের দিকে। সোজাসুজি একটা রাস্তা গেছে থানার দিকে।

থানার দিকের রাস্তাটি একটু নিরিবিলি। বাজারের দিকের রাস্তাটিতে সব সময়ই লোকজন গিজগিজ করে। এ সময় বাজারের দিকের রাস্তায় যাবে না বলে ঠিক করলো রবিন। তাই সে ডান দিকের পথে না গিয়ে সোজা হাঁটতে লাগলো। সোজা রাস্তা ধরে কিছুটা হাঁটলে বাঁদিকে আরও একটি মাটির রাস্তা চলে গেছে সোজা অনেক দূরে। এই রাস্তাটিই রবিনের দাদাবাড়ি যাওয়ার পথ।

দাদাবাড়ির কথা মনে পড়তেই রবিনের সারা গা শিরশির করে উঠলো। চার বছর আগের কথা। রবিন তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। প্রাইমারি স্কুল ছেড়ে হাই স্কুলে ভর্তি হয়েই রবিনের মনে হয়েছিলো সে এখন অন্য এক মানুষ। এখন আর ছোটটি নেই সে।

সেবার ওরা গিয়েছিলো দাদাবাড়ি বেড়াতে। একদিন দুপুরে তেঁতুলগাছের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় কী ভয়টাই না পেয়েছিলো সে-সে কথা মনে হলে যখন তখন শিরশির করে ওঠে ওর গা।

রাস্তার পাশের তেঁতুলগাছটায় যে ভূতের আস্তানা আছে সে কথা শুধু রবিন নয়, এ গ্রামের সবাইই জানতো। জানতো এবং সেই সঙ্গে বিশ্বাসও করতো। বড়দের মধ্যেও অনেকে একা একা তেঁতুলগাছটির নিচ দিয়ে যেতে চাইতো না। গ্রামের কেউ কোনোদিন না দেখলেও অনেকেই বিশ্বাস করতো তেঁতুলগাছের ভূতটির কথা। বিশ্বাস করতো না শুধু একজন। সে হলো রবিনের চাচাতো ভাই বশির।

সেদিন দুপুরবেলা রবিন হাঁটছিলো তেঁতুলগাছটির নিচ দিয়ে। ওই সময় নির্জন পথে একা একা হাঁটতে ভয় লাগার কথা রবিনের। কিন্তু যে ছেলে প্রাইমারি পাস করে হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছে সে কেন ভূতের ভয় পাবে? বেশ সাহস নিয়েই রবিন গাছটিকে প্রায় পেরিয়ে যাচ্ছিলো।

কিন্তু না, শেষটা খুব মধুর হলো না।

হঠাত্ করেই তেঁতুলগাছটির একটি ডাল ঝরঝর ঝরঝর করে নড়ে উঠলো। তার ওপর অনেকগুলো তেঁতুল তার ডানে বাঁয়ে সামনে পিছনে ছড়িয়ে পড়লো। ঘটনাটা এমন আচমকা ঘটলো যে রবিনের ভয় পাওয়া উচিত কি না চিন্তা করার সময়ও পেলো না সে।

রবিন ভয় পেয়ে গেলো।

ভয় পেয়ে দৌড় দিতেই তার পিছনে ঝপাত্ করে একটা শব্দ হলো। সেই শব্দে রবিনের ভয়ের মাত্রা এবং দৌড়ের গতি দুটোই বেড়ে গেলো। এমন সময় পিছনে বশিরের গলা শুনে সে থমকে দাঁড়ালো।

বশির সেদিন বলেছিলো, কী রে রবিন, তুই নাকি সৈনিক হবি? এইটুকুতেই এতো ভয় পেয়ে গেলি!

এখন রবিনের মনে হচ্ছে সেদিন সে কতোই ছোট ছিলো। আর এখন? এখন তো রবিন কতো লম্বা হয়েছে। দাদু একবার বলেছিলেন, তোর মাথায় একটা পাথর চাপা দিয়ে রাখিস। নইলে মাথাটা একসময় আকাশ ছোঁবে কিন্তু।

তা রবিন ওর বন্ধুদের সবার চেয়ে লম্বাই শুধু নয়, বলা যায় অনেক লম্বা। আর সাহস? সে একবার যুদ্ধে যেতে পারলে দেখা যাবে। পাকিস্তানি সৈন্যদের একেকটাকে ধরবে আর ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে কল্লা কাটবে।

এসব ভাবতে ভাবতে কোন সময় যে রবিন ওর দাদাবাড়ির পথে হাঁটা শুরু করেছে নিজেও খেয়াল করেনি। শুধু হাঁটাই শুরু করেনি, মনে মনে হিসাব কষে দেখলো রবিন, দেড় মাইল রাস্তা সে পেরিয়ে এসেছে।

রবিনদের বাসা থেকে ওদের দাদাবাড়ির দূরত্ব তিন মাইল। সেই পথের মাঝ ধরা হয় এ জায়গাটিকে। এই তিন মাইল পথ যারা হেঁটে পাড়ি দেয় তারা এ জায়গায় এসে মনে করে-অর্ধেক পথ এসে গেছি তাহলে।

একটি রিজার্ভ পুকুরের পাশেই একটি ছোট্ট দোকান রয়েছে এখানে। রিজার্ভ পুকুর মানে সংরক্ষিত পুকুর। মানে এ পুকুরের পানি খাওয়ার জন্য সংরক্ষণ করা হয়। গ্রামের মানুষ বহু দূর থেকে কলস ভর্তি করে খাওয়ার জন্য এ পুকুরের পানি নিয়ে যায়। এইসব পুকুরে কেউ গোছল করা তো দূরের কথা, হাত-পাও ভিজায় না।

দোকানের সামনে একটি বেঞ্চ। দুটি খুঁটি পুঁতে তার ওপর একটি তক্তা পেরেক মেরে আটকে দেওয়া হয়েছে। অর্ধেক পথ হেঁটে আসার পর একটু দম নেওয়ার জন্য লোকজন এই বেঞ্চে বসে একটু জিরিয়ে নেয়। বেঞ্চের পাশেই একটি মাটির বড় মটকিতে পাশের পুকুরের ঠাণ্ডা টলটলে জল। গলার সঙ্গে রশি দিয়ে বাঁধা একটি অ্যালুমিনিয়ামের মগ। ক্লান্ত পথচারীরা বেঞ্চে বসে দু’মগ পানি খেয়ে নেয়। তারপর কেউ ইচ্ছা হলে দোকান থেকে চারআনার গজা কিনে খায়। কেউবা দুই পয়সার পাতার বিড়ি কিনে দোকানে রাখা ফাইভস্টার ম্যাচলাইট দিয়ে ধরিয়ে ফুঁকতে থাকে।

আজকাল রূপনগর কলেজে পড়তে যাওয়া কিছু ছেলেও এ রাস্তায় চলাচল করে। তাদের জন্য দোকানদার এক প্যাকেট স্টার সিগারেট রাখে।

কেউ তার দোকান থেকে কিছু কিনলো কি কিনলো না সেদিকে দোকানির খুব একটা খেয়াল নেই। তবে যে কেউ তার দোকানের সামনে বসে দু’মগ পানি খেলে সে খুব খুশি হয়। আর বসে যদি কতক্ষণ গল্প করে তবে তো কথাই নেই।

পায়ে পায়ে দোকানটার দিকে এগিয়ে গেল রবিন। ইংলিশ প্যান্টের পকেট হাতড়ে চানতারা মার্কা একটি তামার পাঁচ পয়সা দিয়ে দোকানদারের কাছ থেকে একটি স্টার সিগ্রেট কিনলো সে। সিগারেটটা ধরিয়ে খুব গর্ব গর্ব ভাব নিয়ে কষে এক টান দিলো রবিন। হ্যাঁ, এবার নিজেকে সত্যিকারের বড় মানুষ বলে মনে হচ্ছে তার।

কিন্তু না গর্বের ভাবটা বেশিক্ষণ থাকলো না, সিগ্রেটে দ্বিতীয় টান দিতেই খকখক করে কেশে উঠলো সে।

এমন সময় ব্যস্ত এক পথচারী এসে থামলো দোকানের সামনে। সকালে রেখে যাওয়া ছোট্ট শিশিটায় চারআনার কেরোসিন নিয়ে এক্ষুনি বাড়ি ফিরবে সে। তার মুখেই রবিন জানতে পারে রূপনগর বাজারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এসেছে। রূপনগর থানার ঘাটে ছোট ছোট কয়েকটি লঞ্চে করে তারা এসে নামছে। এই খবর পেয়ে বাজার একদম ফাঁকা হয়ে গেছে। লোকজন যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে।

সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে রবিনও পিছন ফিরে হাঁটা শুরু করলো। রূপনগর থানার কাছ দিয়েই তাকে বাসায় ফিরতে হবে। এখন সেখানকার কী অবস্থা কে জানে!

 

পর্ব-৫

ভোরবেলা থানা থেকে পালিয়ে এসে শিশির ওদের বৈঠকখানায় ঢুকে ঘুম দিলো। ঘুম থেকে উঠে বাসার কেউ টের পাওয়ার আগেই বই খাতা নিয়ে স্কুলের দিকে ছুটলো।

শিশিরদের বাসার একমাত্র ঘড়িটা ওর বাবা সকালবেলাই হাতে দিয়ে বেরিয়ে যান বলে ওরা কখনও ঘড়ি দেখে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না। ওদের পরিবারে ঘড়ির বিকল্প হিসেবে যে যন্ত্রটা কাজ করে সেটা হলো একটা ট্রানজিস্টর রেডিও। সেটা থাকে বাবার রুমে কাঠের টেবিলটার ওপর। রেডিওটা খুললেই ওরা বুঝতে পারে কটা বাজে।

সকালবেলা রেডিওতে খবর শুনতে পেলে ওরা বুঝে নেয় নয়টা বেজেছে। জীবনটীকা শুনলে বুঝে যায় নটা পাঁচ পেরিয়ে গেছে। যদি রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনে তাহলে বোঝে সাড়ে নটা, আর নজরুলসঙ্গীত চলতে থাকলে বোঝা যায় যে পৌনে দশটা বেজে গেছে। কিন্তু আজ আর শিশির বেতার যন্ত্রটার কাছে গেলো না সময় জানার জন্য। ওদিকে আকাশে মেঘ ছিলো বলে সূর্য দেখে আন্দাজ করারও উপায় ছিলো না। তাই ওসব দিকে চিন্তা না করেই শিশির ছুটলো স্কুলের দিকে।

ইচ্ছা ছিলো রবিনের সঙ্গে আজ আরও খোলাখুলি আলাপ করবে। কিন্তু বাসা ছেড়ে কিছুটা সামনের দিকে হাঁটতেই ভুল ভাঙলো তার। ওদের স্কুলের ইউনিফর্ম পরা অন্যসব ছেলে স্কুল থেকে বাড়ির দিকে ফিরছে। মুহূর্তে নিজের ভুল বুঝতে পারলো শিশির। গত রাতে না ঘুমানোয় লম্বা ঘুম দিয়ে উঠেছে শিশির। ততোক্ষণে সকাল-দুপুর গড়িয়ে বিকেল পড়েছে। রবিনের সঙ্গে দেখা হলো না বলে মন খারাপ হলো তার।

এদিকে শিশিরের বাবার চিন্তা হঠাত্ করেই বেড়ে গেলো অনেক। তার বড় ছেলে, মানে শিশিরের দাদা সুব্রত, পড়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। ভার্সিটি তো বন্ধ হয়েছে সেই কবে। কিন্তু সুব্রত আজও বাড়ি ফেরেনি।

ছেলে বাড়ি ফেরেনি অথচ সে নিয়ে শিশিরের বাবার কোনো মাথাব্যথা এতোদিন ছিলো না। তার চিন্তা শুরু হয়েছে স্থানীয় শান্তি কমিটির এক লোক সেদিন শিশিরদের বাড়িতে আসার পর থেকে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রূপনগরে আসার খবরে বাবার সে টেনশন কেনো আরও বেড়ে গেছে তা অন্য কেউ না বুঝলেও শিশির ঠিকই বুঝতে পারলো।

বুঝতে পেরে গর্বে ভরে উঠলো শিশিরের মন। সুব্রতদাকে একটু অন্যরকম ভালোবাসে শিশির। ছোটবেলা থেকেই শিশিরের যতো বায়না আবদার সব তার দাদার কাছেই। আর সব সময় চাইতেও হয় না। দাদা যে কী করে বুঝতে পারে শিশিরের কখন কী দরকার! গতবার তো ভার্সিটি থেকে ছুটি পেয়েই আস্ত একটা দুই নম্বর ফুটবল নিয়ে হাজির। পেয়ে কী যে খুশি হয়েছিলো শিশির! দাদা বলেছিলেন প্রতিদিন খুব ভোরে উঠে ফুটবলটা পায়ে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করার জন্য। তাতে ফুটবল ট্যাকলিং যেমন শেখা হবে, তেমনি প্রতিদিনকার ব্যায়ামটাও হয়ে যাবে।

ফুটবলের কথা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা ঘটনার কথা মনে হলো রবিনের।

অনেকদিন আগে একবার দাদার সঙ্গে দাদার স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে গিয়েছিলো শিশির। এখন অবশ্য সেই স্কুলটাই শিশিরদের স্কুল। আর সুব্রতদা তো স্কুলের পড়া শেষ করে কলেজে কিছুদিন লেখাপড়া করে ঢাকা ভার্সিটিতে গিয়ে ভর্তি হয়েছেন।

খেলা চলছিলো স্থানীয় টাউন ক্লাব আর জুয়েলস ক্লাবের মধ্যে। ফাইনাল খেলা। টাউন ক্লাবের খেলোয়াড়রা খুব ভালো খেলছিলো কিন্তু জুয়েলস ক্লাবের বাদল গুলির কারণে গোল দিতে পারছিলো না। গোলকিপারকে ওরা গুলি বলে। পারবে কীভাবে! বাদল গুলি এতোটাই লম্বা যে তার মাথাই প্রায় বারপোস্টে গিয়ে ঠেকে। আর দুদিকে দুহাত বাড়ালে মনে হয় গোলপোস্ট পুরোটাই আগলে আছে বাদল গুলি। একটা বল যাওয়ার জায়গাও নেই কোনোখানে।

তো হঠাত্ কী একটা ব্যাপার নিয়ে দুপক্ষের খেলোয়াড়দের মধ্যে শুরু হয়ে গেলো হাতাহাতি। তারপর তো সে কী মারামারি! যে যাকে সামনে পাচ্ছে কিল ঘুসি থাপ্পড় মারছে। সেই মারামারির মধ্যে শিশির দৌড়াবে কী, সে প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলো। তখন দাদা ওকে কাঁধে তুলে নিয়ে দৌড়ে পালালো।

আরেকবার নিজের পকেটের তিন-তিনটে টাকা খরচ করে একটা স্লেট-পেন্সিল আর ‘আগে পড়ি’ নামে একটা বই কিনে দিয়েছিলো। সেই বই পড়ে শিশির ক খ গ ঘ লিখতে শিখেছিলো। তারপর নিজের নাম লিখতে পারার আগেই সুব্রত নামটা লিখতে শিখেছিলো শিশির। লিখে দাদার টেবিলে এক টুকরো গ্লাসের নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিলো। দেখতে পেয়ে দাদাও যে কী খুশি হয়েছিলো! সেদিন থেকেই সুব্রত আর শিশির দুজন মিলে একপ্রাণ হয়ে গেলো।

সেই দাদা শিশিরকে না নিয়ে, এমনকি না জানিয়ে যুদ্ধে চলে গেলো! এতে শিশিরের একটু অভিমানও হলো দাদার প্রতি। কেন, ওকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলে কী হতো? শিশির যে আর আগের সেই ছোট্টটি নেই সেটা কি জানে না দাদা!

 

পর্ব-৬

রবিন তাড়াতাড়ি ফিরে এলো ঠিকই কিন্তু থানার ঘাটে কী হচ্ছে তা দেখার কৌতূহল থেকে নিজেকে ফেরাতে না পারায় ঘুরপথে বাসার রাস্তা না ধরে সোজা থানার দিকে হাঁটতে লাগলো। ঘাটের অনেকটা দূরে থেকেই সে বুঝতে পারলো সে যা শুনেছে তা মিথ্যা নয়। ঘাটে ছোট্ট ছোট্ট তিনটি লঞ্চ বাঁধা। কয়েকজন লোক লঞ্চ থেকে বড়ো বড়ো অনেকগুলো প্যাকেট নামাচ্ছে।

থানার সামনের মোড়টা ঘুরে ডানদিকে হাঁটতে যাবে রবিন, এমন সময় পেছন থেকে এক চিত্কার ভেসে এলো, ঠারো।

রবিন থমকে দাঁড়ালো কিন্তু আদেশটা কাকে করা হয়েছে ঠিকমতো বুঝতে পারলো না। পেছন ফিরে দেখলো একটা পাকিস্তানি মিলিটারি তার দিকে তাকিয়েই কমান্ডটা করেছে। মিলিটারিটা হাতের ইশারায় কাছে ডাকলো রবিনকে।

এই মুহূর্তে রবিনের ভয় পাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে রবিন একেবারে নির্ভয়ে আস্তে আস্তে পা ফেলে মিলিটারিটার দিকে হেঁটে গেলো। কাছে যেতেই সে জিজ্ঞেস করলো, নাম ক্যায়া হায় তুমহারা?

লোকটির মুখে উর্দু শুনে রবিনের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। এই উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ করতে গিয়ে একদিন বাঙালিরা বুকের রক্ত দিয়েছিলো। আজ এই লোকটা উর্দুতে রবিনের সঙ্গে কথা বলছে!  মনে মনে জেদ চাপলো ওর, কিছুতেই উর্দু কথার জবাব দেবে না। লোকটি এবার আরও জোরে চিত্কার করে উঠলো, কিয়া নাম?

রবিন এবারও কোনো কথা বললো না। এমন সময় কাছাকাছি কোথাও থেকে কেদার চাচা ছুটে এলেন। সে আগে থেকেই অবশ্য জানতো যে কেদার চাচা রাজাকারের দলে নাম লিখিয়েছে। কেদার মিয়া ছুটে এসে বললো, হুজুর ও হয়তো আপনার উর্দু কথা বুঝতে পারছে না।

বহুত আচ্ছা, ম্যায় জো জাননা চাহাতে হু উসকো পুছো বাদমে হামকো বোলো, পহেলে পুছো উসকা নাম আওর ওয়ালিদ কা নাম কেয়া হ্যায়।

কেদার মিয়া রবিনকে কিছু জিজ্ঞেস না করে নিজে থেকেই তার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলো, হুজুর ও হচ্ছে ফখরুদ্দীন খান সাহেবের ছেলে রবিন।

ক্যায়া, খান সাহাবকা লাড়কা? ঠিক হ্যায় উহ তো হামারা আপনা আদমি। উসকো বোলো লনস সে বান্ডিল উতারনে কে লিয়ে মদদ কারে।

রাজাকার লোকটি বাংলায় তার কথা রবিনকে বুঝিয়ে দিলো। কিন্তু এবারও রবিন নড়াচড়া করলো না, এমনকি কোনো কথা পর্যন্ত বললো না। পাকিস্তানিটি কয়েকবার ধমক দেওয়ার পরও রবিন যখন কোনো কথা না বলে গ্যাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো তখন রাজাকার লোকটি বললো, হুজুর, ও ছোটো মানুষ, সারাদিন স্কুল করে বাড়ি ফিরছে। এখন হয়তো ওর ক্ষুধা লেগেছে, তাই এ কাজ করতে চাইছে না।

ঠিক হ্যায়। উসকো জানে দো।

রবিন মনে মনে বললো, শুয়োরের বাচ্চা, তোদের সাইজ করার জন্য শিগগিরই ফিরে আসছি। সে পর্যন্ত অপেক্ষা কর।

 

পর্ব-৭

সেই রাতেই রূপনগরে অনেকগুলো কাণ্ড ঘটে গেল। শিশিরদের সবার সামনে থেকে শিশিরের বাবাকে ডেকে নিয়ে গেলো একদল লোক। কিছুক্ষণ পর খালপাড়ের দিক থেকে একটা গুলির আওয়াজ ভেসে এলো। অরুণ বাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো-সে তার বড় ছেলেকে যুদ্ধে পাঠিয়েছে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও মর্মান্তিক। বাজারের পাশেই এক হিন্দুবাড়ি থেকে একুশ জনকে ধরে এনে, এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারলো পাকিস্তানি সেনারা। পুড়িয়ে দেওয়া হলো সে বাড়ির সবগুলো ঘর। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় আরও অনেক বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হলো।

এর পরের ঘটনাটি শুধু মর্মান্তিকই নয়, কল্পনা করারও অযোগ্য। শিশিরের বাবাকে মেরেই রাজাকারের দলটি যায় পণ্ডিত স্যারদের বাসায়। তাকে যখন খালপাড়ে এনে দাঁড় করানো হয় তখন তিনি তার পরিণতি আঁচ করতে পারেন। রাজাকার দলটির মধ্যে অনেককেই চিনতেন পণ্ডিত স্যার। সেই চেনামুখগুলোর মধ্যে তারই এক ছাত্র ফুয়াদকে দেখতে পেয়ে আনন্দে তার চোখ দুটো চকচক করে উঠেছিলো।

অ্যাই, তুই আমার ছাত্র ফুয়াদ না? চিত্কার করে বলেছিলেন স্যার।

কিন্তু ফুয়াদের হাতে তার দিকে তাক করা অস্ত্র দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই চুপসে গিয়েছিলেন তিনি। শেষে ঠাণ্ডা গলায় তিনি বলেছিলেন, আমাকে যখন মারবিই, আয় তুইই আমাকে গুলি কর। তবু সান্ত্বনা থাকবে এই যে, আমার প্রিয় এক ছাত্রের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে আমার।

ফুয়াদ ঠিকই গুলি করেছিলো। মৃত্যুর আগে স্যার একবার শুধু উচ্চারণ করেছিলেন, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।

এরপর রাতারাতি পাল্টে গেলো রূপনগরের পরিবেশ।

দু’দিনেই এক ভুতুড়ে এলাকায় রূপ নিলো এলাকাটি। যাদের পালাবার মতো জায়গা আছে তারা সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে জীবন নিয়ে পালাতে থাকলো। আর যাদের সে সুযোগ নেই তারা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে অজানা বিপদের আশঙ্কায় সময় কাটাতে লাগলো। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়লো যেসব পরিবারে যুবক ছেলে আছে তারা। যুবক ছেলেদের ঘরে রাখা দায়, কারণ পাকিস্তানি সেনারা যুবক ছেলে পেলেই ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আবার তারা যদি বাড়িতে না থাকে তাহলে আরেক বিপদ। সে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে এই সন্দেহে তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এই অবস্থায় রবিনের আব্বা ঠিক করলেন তারা গ্রামের বাড়িতে চলে যাবেন।

হঠাত্ এই সিদ্ধান্তে সমস্যায় পড়লো রবিন। গত ক’দিনে সে মানসিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে এখান থেকে সে পালিয়ে সুন্দরবন যাবে। শিশির তার সঙ্গী হবে সেটা আগেই ধারণা করেছিলো।

কিন্তু মাঝখানে রাজাকারদের হাতে শিশিরের বাবা খুন হওয়ায় ওর মানসিক অবস্থা কেমন তা এখন জানে না রবিন। রবিন সিদ্ধান্ত নেয়, আজ রাতেই শিশিরের সঙ্গে যোগাযোগ করবে সে। শিশির যদি যেতে না চায় তাহলে একা একাই পালাবে। রাস্তাঘাটের ধারণা তো পণ্ডিত স্যারের ক্লাস থেকে পেয়েছেই।

মা-বাবা জানতে পারলে কিছুতেই যেতে দেবেন না। অতএব পালানোই হবে সহজ পথ। পালাতে হবে এবং সেটা আজ রাতেই। বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে গেলে ওর সমস্ত প্ল্যানই নষ্ট হয়ে যাবে।

 

পর্ব-৮

১৯৬৪ সালে শিশিররা একবার ভারতে চলে গিয়েছিলো। চলে গিয়েছিলো না বলে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলো বলা যায়। সেবার হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে বিরাট এক দাঙ্গা হয়। হিন্দুরা মুসলমানকে আর মুসলমানরা হিন্দু কাউকে নিজের এলাকায় পেলে জবাই করে ফেলতো। তখন নিরাপত্তার জন্য পশ্চিমবাংলার মুসলমানরা পূর্ববাংলায় এবং পূর্ববাংলার হিন্দুরা পশ্চিমবাংলায় চলে যায়। নামে পূর্ব ও পশ্চিমবাংলা হলেও এ দুটি অঞ্চলের একটি পাকিস্তানের অংশ, অন্যটি ভারতের।

শিশিরদের পাড়ায় একমাত্র হিন্দু গেরস্ত ছিলো ওরাই। হলে কী হবে, ওদের পাড়ার বিশ-পঁচিশ ঘর গেরস্তের মধ্যে সম্পর্ক এতোই ভালো ছিলো যে প্রথম প্রথম দেশ ছাড়ার কথা চিন্তাই করতো না ওরা। এছাড়া পড়শীরা সবাই ওদের অভয় দিতো। বলতো, সারা দেশে যা হয় হোক গিয়ে, আমাদের এ পাড়ায় রায়ট বা দাঙ্গা এরকম কিছু হবে না।

কিন্তু দিনে দিনে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে সেই পড়শীরাই একসময় শিশিরের বাবাকে বলতে শুরু করে, দাদা, দেশের যে অবস্থা, কখন কী হয় বলা তো যায় না, একটু সাবধানে চলবেন।

এজন্য অবশ্য তাদরকে দোষ দিয়েও লাভ নেই। অবস্থা দিনে দিনে আসলেই ভয়াবহ আকার নিয়েছিলো।

শিশিরের বাবা সেদিনও তেমন একটা ভয় পেলেন না। কিন্তু ঘাবড়ালেন সেদিন যেদিন অন্য পাড়ার কয়েকটি যুবকের সঙ্গে এ পাড়ার যুবকদের প্রায় মারামারি লেগে গেলো।

শিশিরদের পাড়ায় ঢোকার মুখেই একটি ক্লাব ঘর। সেই ক্লাবের রঞ্জু হঠাত্ করেই পাড়ার সব যুবককে খবর দিলো। সালাউদ্দিন, বাদল, রফিক, মঞ্জু-সবাই এসে হাজির হলো রঞ্জুর তলব পেয়ে। সবাইকে ডেকে রঞ্জু কিছুটা ভাষণ দেওয়ার মতো করেই বলেছিলো, সারা দেশে দাঙ্গা যতোই ছড়াক না কেন, আমাদের পাড়ার শান্তি যেনো কোনোভাবেই নষ্ট না হয়। মাত্র একটি হিন্দু পরিবার এ পাড়ায়। তাদের যেনো কোনো ক্ষতি না হয়।

রঞ্জুর কথা শুনে রফিক বলেছিলো, তোর কি মনে হয় তাদের ক্ষতি হওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে?

আছে বলেই তো তোদেরকে সাবধান করলাম।

কিন্তু সবকিছু খুলে না বললে আমরা বুঝবো কীভাবে? আর আগে থেকে প্রস্তুত না থাকলে তাদেরকে বাঁচাবোই বা কীভাবে?

শোন, দু’দিন ধরে খেয়াল করছি আশপাশের পাড়ার বখাটে কিছু ছেলে আমাদের পাড়ার এদিকে ঘোরাঘুরি করছে। দেখেশুনে ওদের মতলব ভালো মনে হচ্ছে না। তাই আমাদের আগেই সাবধান হতে হবে।

ওরা যখন এসব নিয়ে আলোচনা করছিলো তখনই খালপাড়ের পাশের রাস্তায় সাত-আট যুবকের দিকে চোখ পড়লো ওদের। রঞ্জু বললো, ওই দেখ ওরা আবার এসেছে।

সালাউদ্দিন বললো, একটা কাজ করলে হয় না! ওদের ডেকে জিজ্ঞেস করি কেনো এদিকে ঘোরাঘুরি করছে।

কিন্তু ওরা তো ভালো ছেলে না। কিছু জিজ্ঞেস করলেই ঝামেলা বাধাবে।

তাই বলে চুপ করে বসে থাকলেও তো শান্তিতে থাকতে পারবো না আমরা। শান্তিতে থাকতে দেবে না ওরা।

ওদের মধ্যে বাদল সব সময়ই কথা কম বলে। কিন্তু প্রচণ্ড সাহসী আর বদমেজাজী বলে তার নাম আছে। হঠাত্ করে সে একটা কাণ্ড করে বসলো। খালপাড়ের দিকে তাকিয়ে চিত্কার করে উঠলো-এ-ই-ই, তোরা এপাড়ায় এসে ঘুরঘুর করছিস কেন?

বলার সঙ্গে সঙ্গে যুবকদের পুরো দলটা পেছন ফিরে চাইলো।

দলের মধ্যে নেতা গোছের একটি ছেলে এগিয়ে এলো সামনে। পেছনে ঘুরে গেল পুরো দলটা।

কী বলতে চাস?

বাদল আর বসে থাকতে পারলো না। দাঁড়িয়ে আবারও চিত্কার করে বললো-বলছি, নিজেদের পাড়া রেখে এ পাড়ায় ঘুরঘুর করছিস যে?

কেবল তো ঘুরঘুরই করছি, আসল খেল্ তো এখনও দেখাইনি।

খেল্ দেখাবি মানে? কী খেল্ দেখাবি তুই? আক্রমণের ভঙ্গিতে কিছুটা সামনে এগিয়ে যায় বাদল। সালাহউদ্দিন বাধা দেয় তাকে।

সেটা সময় হলেই দেখবি। তবে তোদের সাবধান করে দিচ্ছি শত্রুদের প্রতি বেশি দরদ দেখাতে যাস নে, শেষে নিজেরাই বিপদে পড়বি। অবস্থা বুঝতে পেরে বিপক্ষ দলও কিছুটা পেছন হটে।

তোদেরকেও সাবধান করে দিচ্ছি আমি, এ পাড়ায় আমরা যারা থাকি সবাই আমরা বন্ধু, কোনো শত্রু নেই। আগ বাড়িয়ে ফাজলামি করতে আসবি তো হাড্ডি গুঁড়ো করে দেবো।

তোদের মুরোদ কত আছে সে দেখা যাবে সময় হলেই।

গজরাতে গজরাতে চলে গিয়েছিলো যুবকদের দলটি।

রাতেই সব খবর পৌঁছে গিয়েছিলো শিশিরের বাবার কানে। শোনার পর এক মুহূর্ত দেরি করতে রাজি হননি শিশিরের বাবা। বাড়ির সমস্ত মালামাল মেম্বার সাবের ঘরে তুলে দিয়ে, জায়গা-জমির মায়া ছেড়েছুড়ে রাতেই দেশ ছেড়েছিলেন।

কিছুদিন পর অবশ্য সব আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছিলো। ফিরে এসেছিলেন শিশিরের বাবা পরিবার নিয়ে।

ভাগ্য ভালো তার। ফিরে এসে সব মাল-জিনিসই যেমনটা ছিলো তেমন অবস্থায় ফেরত পেয়েছিলেন। মেম্বার সাবের বউ সবকিছুই নিজের মতো করে আগলে রেখেছিলেন। কাঁসা পিতলের হাঁড়ি পাতিল পেয়ালা বাটিগুলো পুকুরের পানির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। আর সোনা রুপার অলঙ্কার রেখেছিলেন মাটিচাপা দিয়ে।

শিশিরদের পরিবার ফিরে আসায় তিনি যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। সবকিছু ফিরিয়ে দিলেন তিনি।

সব ফিরে পেয়ে শিশিরের মা তো ভীষণ খুশি। রবিনের মাকে বলেছিলেন তিনি, দিদি আপনিই শুধু এতো কিছু হাতে পেয়েও আবার ফিরিয়ে দিলেন। অন্য কেউ হলে দিতো না।

তা অন্য লোকজন ফেরত দেবে কী, অনেকেই বরং সুযোগ পেয়ে তখন হিন্দুদের সবকিছু লুট করেছে সে কথা রবিনের মাও জানতো। তবু বললো, আরে না, এ আর এমন কী, আপনাদের বিপদের সময় কিছুটা হলেও যে আপনাদের উপকার করতে পেরেছি এটাই তো অনেক কিছু।

শিশির অবশ্য তখন বেশ ছোটো। তবে তার স্পষ্ট মনে আছে এসব কথা। মানুষের বিচিত্র চরিত্রের কথা ভাবছিলো আর আশ্চর্য হচ্ছিলো শিশির। একই দেশের একই আবহাওয়ার এমনকি একই জাতির মানুষ হয়েও মানসিকতায় কত তফাত থাকতে পারে মানুষের মধ্যে। যে যুবক ছেলেগুলোর কোনো ক্ষতি না করার পরও শিশিরের বাবা তাদের শত্রু-তাদের এক চরিত্র। যে একুশ ঘর পরিবার নিজেদের বিপদের কথা চিন্তা না করে শিশিরদের আগলে রাখতে চাইছিলো-তাদের এক চরিত্র। আর যারা শুধু শুধুই শিশিরের বাবার মতো একজন নিরীহ মানুষকে গুলি করে মারলো-তাদের এক চরিত্র। তারপরও শিশির ভেবে দেখলো, এই পৃথিবীতে এখনও ভালো মানুষদের সংখ্যাই বেশি।

 

পর্ব-৯

নৌকাঘাটের পাশের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে জব্বার মাঝির দিকে চোখ পড়লো রবিনের বাবার। একই সঙ্গে জব্বার মাঝিরও চোখ পড়লো ফখরুদ্দীন খান সাহেবের দিকে। চোখ পড়তেই চেঁচিয়ে উঠলো মাঝি-মিয়াভাই কেমন আছেন? অনেকদিন আপনের বাসায় যাই না। ভাবীছাব কেমন আছেন?

ভালো। বলেই ইশারায় মাঝিকে কাছে ডাকলেন খান সাহেব।

মাঝি তার ছোট্ট চুলায় আমকাঠের লাকড়ি দিয়ে জ্বাল দিচ্ছিলো। মাটির হাঁড়িতে ভাত রান্না করছিলো সে। ইশারা পেয়েই তাড়াতাড়ি নৌকা থেকে লাফিয়ে নেমে খান সাহেবের কাছে এলো।

মাঝিকে ডেকে একটা নিরালা জায়গা খুঁজতে লাগলেন ফখরুদ্দীন খান। পেয়েও গেলেন। খালের পাশেই ছোট্ট একটা দোকান। দুপুরের গরমে সেখানে বসে ধুঁকছে বাচ্চা একটি ছেলে। রাস্তায় লোকজন তেমন একটা নেই। মাঝিকে নিয়ে দোকানের সামনে পেতে রাখা বেঞ্চটিতে বসলেন খান সাহেব। বসেই নিজে একটা সিগারেট ধরালেন, মাঝিকেও দিলেন একটা। তারপর আস্তে করে বললেন, জব্বার রে, এখানে তো আর থাকতে পারছি না। বদমাশগুলো খুব বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করেছে।

মিয়াভাই, কইছিলাম কী, গেরামের বাড়ি চলেন, আমাগো গেরামটা এহনও নিরাপদ আছে।

জব্বার মাঝি খান সাহেবদের গ্রামেরই লোক।

সেজন্যই তোকে ডাকলাম।

চলেন তাইলে। কবে যাইবেন? কহন?

আজই।

কিন্তু মিয়াভাই, যাইতে হইবে রাইতে। নইলে ওই হালার পো হালারা সন্দেহ করবে।

হ্যাঁ রাত্রেই যাবো।

তাইলে একটা কাম করেন, আপনেরা সবকিছু ঠিকঠাক কইরা রাইখেন, আমি ঠিক মাঝরাত্তিরে আপনেগো ঘাটে থাকমু।

আমাদের ঘাটটা খুব একটা নিরাপদ না। থানার স্পিডবোটগুলো দিন রাত সব সময় ওই পথেই চলে।

রাইতে বেশি একটা চলে না। অগো মনেও তো এহন কম ডর না। জাগায় জাগায় গুড়াগাড়া পোলাপানের ধারে মাইর খাইতেছে।

তুই দেখি এইসব খবরও রাখিস।

রাখমু না মিয়াভাই! জানেন আমার নাওতে একখান রেডিও আছে।

বলিস কী? কেউ জানতে পারলে কী হবে জানিস?

জানি। তয় চিন্তা নাই। রাখছি এমন জায়গায় অগো চৌদ্দ গুষ্টিরও সাধ্য নাই বিচড়াইয়া বাইর করবে।

কই রেখেছিস?

রাখছি নাওয়ের গুড়ার মইধ্যে, যেই জায়গায় বইয়া নৌকা বাই হেই জায়গায় একটা খোড়ল বানাইয়া হেইর মইধ্যে রাখছি। বাইরে দিয়া বোজনোর কোনো উপায় নাই।

যখন শুনতে বের করিস তখন যদি কেউ দেখে ফেলে?

দেখবে না। বনজঙ্গলের মধ্যে নিরিবিলি জায়গা পাইলেই খালি বাইর করি টানজিস্টরডা। বাইর কইরা ওই যে মুকুল না কেডা যেনো একটা চরমপতরো না কী পড়ে হেইডা হোনতে খুব মজা লাগে। আর শেখ সাইবের ভাষণ যহন শুনি, বিশ্বাস করেন মিয়াভাই, গায়ে কাডা দিয়া ওডে। মনে হয় বৈঠা লইয়া এহনই ঝাপাইয়া পড়ি। বৈঠা দিয়া ওই হালার পো হালাগো একটা একটা কইরা পিডাইয়া মারি।

জব্বার মাঝির মধ্যে চাপা একটা উত্তেজনা টের পান খান সাহেব।

কেউ তাদের কথা শুনে ফেলছে নাকি খেয়াল করার জন্য এদিক ওদিক তাকান ফখরুদ্দীন খান।

না কেউ নেই। দোকানের ছোট্ট ছেলেটা ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে তাঁদের দিকে। কিন্তু তাঁদের কথা শুনছে কি না বা শুনলেও কিছু বুঝতে পারছে কি না বোঝা যাচ্ছে না তার চোখ দেখে। দূরে কবরস্থানের পাশে ঘাস খাচ্ছে কয়েকটি গরু।

জব্বার মাঝি আবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে আসে। চিন্তা কইরেন না মিয়াভাই। দেইখেন আমাগো পোলাপানে ঠিকই একদিন অগো এই দেশ দিয়া খেদাইবে।

তা ঠিক, তবুও এ মুহূর্তে আমাদের সাবধান থাকা ভালো। সাবধানের তো কোনো মার নেই।

আপনেরা আগে হইতেই রেডি হইয়া থাকলে সময় বেশি লাগবে না মিয়াভাই। আপনেগো নায়তে উডাইয়াই ছোট খালের ভিতের ঢুইক্যা যামু আমরা। তাইলে আর কোনো বিপদ নাই।

হ্যাঁ। আর যেতে হবে কিন্তু পুবদিকের ওই ছোট্ট খাল দিয়েই। থানার ওদিকে যাওয়া যাবে না।

হেইসব লইয়া আপনের চিন্তা করা লাগবে না। তয় মিয়াভাই দেশের অবস্থা কী হইবে মনে হয় আপনের?

ফখরুদ্দীন খান চোখ ঘুরিয়ে চারদিকটা আরেকবার দেখে নিলেন। না, রাস্তায় কোনো লোকজন নেই। থানার দিক থেকে আসা জোয়ারের পানিতে ঘাটে ভেড়ানো নৌকাগুলো পাড়ের সঙ্গে আড়াআড়ি হয়ে ভিড়ে আছে। খালের ওপার থেকে একটা কুকুর সাঁতরে খাল পাড় হচ্ছে। বারবার দিক পরিবর্তন করেও গন্তব্যের দিকে ঠিকমতো এগুতে পারছে না কুকুরটা। স্রোত তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে।

মাঝির সঙ্গে বলা প্রসঙ্গ ভুলে গিয়ে কুকুরটার অবস্থা দেখতে লাগলেন খান সাহেব। দোকানঘরটা বরাবর সাঁতার দিচ্ছিলো কুকুরটি। কিন্তু খালের মাঝামাঝি আসতে আসতেই স্রোতের ধাক্কায় সে বেশ খানিকটা ডানদিকে চলে গিয়েছিলো। টের পেয়ে বাঁ দিকে ঘুরে স্রোতের উল্টোদিকে সাঁতরালো কিছুক্ষণ, তারপর আবার পাড়ের দিকে সাঁতরাতে শুরু করলো। এবার সে ঠিকই সাঁতরে দোকানটার কাছাকাছি পাড়ে এসে উঠলো। উঠেই ঝাড়া দিয়ে গায়ের পানি ঝরালো। কুকুরটার চোখে মুখে একটা পরিতৃপ্তির ছাপ আন্দাজ করে নিলেন ফখরুদ্দীন খান। এবার চোখ ফেরালেন মাঝির দিকে।

খান সাহেব অন্যমনস্ক থাকায় জোরে জোরে বেশ কয়েক টান দিয়ে সিগারেটটি প্রায় শেষ করে ফেললো মাঝি। মিয়াভাইর দেয়া সিগারেট খেলেও সরাসরি তার সামনাসামনি সিগারেটে টান দেয় না মাঝি। তাই খান সাহেবের অন্যমনস্কতার সুযোগটা নিলো সে। খান সাহেব ফিরে তাকাতেই হাতের সিগারেটটা ছুড়ে মারলো মাঝি। তারপর খান সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো তার প্রশ্নের উত্তরের আশায়। কিন্তু খান সাহেব কোনো উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন মাঝিকেই, তোর কী মনে হয়?

মাইনি?

মানে হলো, তুই যে প্রশ্নটা করেছিস তার উত্তরটা তোর কাছেই জিজ্ঞেস করছি।

আমার মনে হয় কী মিয়াভাই, এইবার বাঙালিরে আর দমাইয়া রাখতে পারবে না। আমাগো এতো এতো পোলাপান যে মরণরে না ডরাইয়া যুদ্ধ করতেছে এইসব তো বৃথা যাইতে পারে না। দেইখেন, জয় আমাগো হইবেই।

আমারও তাই মনে হয়। বলতে বলতেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন খান সাহেব। জব্বার মাঝিও দাঁড়ালো তার সঙ্গে সঙ্গে। মাঝিকে নৌকায় যেতে ইশারা করে বাসার দিকে হাঁটতে লাগলেন ফখরুদ্দীন খান।

 

পর্ব-১০

অরুণ বাবুকে মেরে তাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়ার পর মা শিশিরকে নিয়ে বৈঠকখানা ঘরটিতে আশ্রয় নিলো। এখন আর কোনো ভয় নেই ইন্দুবালা দেবীর। স্বামীর মৃত্যু হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে। বড় ছেলে কোথায় কী অবস্থায় আছে জানেন না তিনি। শুনেছেন যুদ্ধের শুরু থেকেই নাকি সুন্দরবনের কাছাকাছি একটি এলাকায় যুদ্ধ করছে সে। বাবার অনুমতি নিয়েই যুদ্ধে গিয়েছিলো সুব্রত। সেই বাবার মৃত্যু সংবাদ এ পর্যন্ত সে শুনেছে কি না কে জানে! ইন্দুবালা চান সুব্রত জানুক তার বাবার মৃত্যু সংবাদ। তাহলে তার তেজ আরও বেড়ে যাবে। আর সুব্রতদের মতো ছেলেদের শক্তি-সাহস বেড়ে গেলে কেউ ওদের আটকে রাখতে পারবে না। জয়ী ওরা হবেই। হয় জয়ী হবে, নয় বীরের মতো যুদ্ধ করতে করতে জীবন দেবে। দেশের জন্য জীবন দেয়ার ভাগ্য কজনের হয়? শুয়ে শুয়ে এসব কথা ভাবছিলেন ইন্দুবালা। এমন সময় সেখানে ঢুকলো শিশির।

মাগো, তুমি অনন্ত মাসির ওখানে যাবে মা?

কেন?

জায়গাটা এখনও নিরাপদ আছে।

আমার নিরাপদ বা ভয়ের আর কী বাকি আছে বাবা?

ভয়ের কথা বলছি না মা।

আমি জানি তুই কী বলতে চাচ্ছিস। বল, নির্ভয়ে বল। ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন মা।

কিন্তু শিশির চুপ করে রইলো।

শোন বাবা, দেশের জন্য যুদ্ধ করার সৌভাগ্য অনেক মানুষেরই হয় না। তোদের সুযোগ এসেছে। দেশের জন্য বীরের মতো যুদ্ধ করে মরে যাওয়া অথবা দেশকে শত্রুমুক্ত করা দুটোই গৌরবের। কিন্তু আমি অন্য কিছু চিন্তা করছি।

কী চিন্তা করছো মা?

আমি চিন্তা করছি তোর বয়স নিয়ে। এই এতোটুকু ছেলে তুই, কীভাবে যুদ্ধ করবি? সেদিনও মুখে তুলে খাইয়ে না দিলে খেতে পারতিস না। জামাকাপড় পরিয়ে না দিলে পরতে পারতিস না। আর আজ তুই যুদ্ধে যাবি। সুব্রতটাও কোথায় কী অবস্থায় আছে জানি না। এদিকে তোদেরকে ছেড়ে একা একা কী করে থাকবো আমি ভগবানই জানেন।

এজন্যই তোমাকে বলছিলাম অনন্ত মাসির কাছে চলে যেতে।

না রে, যে ভিটায় বসে তোর বাবার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছে আমার, যে ভিটা ছেড়ে তোর বাবা কিছুতেই যেতে চাইতেন না কোনোখানে-সে জায়গা ছেড়ে আমিও কোথাও যাবো না। আর আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না তোরা। তোরা ভালো থাকলে মনে করবি আমিও ভালো আছি।

তুমি শুধু আশীর্বাদ করো মা। তোমার মতো মায়েদের দোয়া থাকলে জয়ী আমরা হবোই।

ছেলের কথা শুনে নিষ্পলক তার দিকে চেয়ে রইলেন ইন্দুবালা।

 

পর্ব-১১

সন্ধ্যারাতেই খোঁজ পড়ে রবিনের। কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাকে। সন্ধ্যায় নাকি তাকে দেখা গেছে ওদের টিনের দোতলা ঘরের ওপরতলায় শুয়ে থাকতে। কিন্তু সন্ধ্যার পর বা রাতে তাকে দেখেছে এমন সাক্ষ্য কেউ দিলো না। রবিনের বাবাসহ সবাই পড়লো মহা মুশকিলে। কিছুক্ষণ পরেই গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা দেবে সবাই। এখানে আর একটা দিন থাকাও নিরাপদ মনে হচ্ছে না। প্রতিদিনই নতুন নতুন সব অঘটন ঘটছে ছোট্ট এই মফস্বল শহরটিতে। এ অবস্থায় হঠাত্ করেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না রবিনকে। কী হতে পারে, কোথায় যেতে পারে অতোটুকু ছেলে-কেউই ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারলো না।

এমন সময় রবিনের ছোটোবোন মিতু দৌড়ে এলো। মা, বাবা, পেয়েছি। এই যে দেখো ভাইয়ার লেখা চিঠি।

চিঠিটা তাড়াতাড়ি হাতে তুলে নিলেন ফখরুদ্দীন খান। নিয়ে প্রথমে জোরে জোরে পড়তে লাগলেন :

মা-বাবা,

আমি চলে যাচ্ছি। দেশের এই দুঃসময়ে এ ছাড়া আমার কিছুই করার ছিলো না। জানি তোমরা খুব দুঃখ পাবে। তবুও আমি নিরুপায়। নিজেদের দিকে, মিতুর দিকে খেয়াল রেখো। আমাকে খুঁজো না। খুঁজলে জানাজানি হবে। তাতে তোমাদের ওপর বিপদ নেমে আসতে পারে। তার চেয়ে আজ রাতেই গ্রামের বাড়িতে চলে যাও। যদি বেঁচে থাকি তবে আবার মাথা উঁচু করে সবাই এ বাড়িতে ফিরে আসবো। আর যদি বেঁচে না থাকি তবেও দুঃখ কোরো না। দেশের জন্য রক্ত দেয়ার সৌভাগ্য সবার হয় না। আমাদের যখন হয়েছে তখন এ সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।…

এ পর্যন্ত পড়েই চেঁচিয়ে উঠলেন ফখরুদ্দীন সাহেব। শাবাশ, এই তো সোনার দেশের সোনার ছেলের মতো কথা।

পাশ থেকে মিতু বলে উঠলো-বাবা ভাইয়া ফিরে আসবে তো?

অবশ্যই আসবে। ওরা কতজনকে মারবে বল? সাড়ে সাত কোটি মানুষকে ওরা মেরে ফেলতে পারবে না নিশ্চয়। দেখিস, রবিনরা একদিন বিজয়ের গর্ব নিয়ে ফিরে আসবেই আসবে।

বলতে বলতে চোখের পাতা ভিজে এলো ফখরুদ্দীন খানের। তার চোখে ভেসে উঠলো ছোট্ট এক রবিনের মুখ। হাফপ্যান্ট পরে বই-স্লেট বগলে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো ছোট্ট রবিন। বাবাকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়লো। -স্কুলে যাচ্ছি বাবা।

-যা। কিছু বলবি?

-দশটা পয়সা দেবে বাবা?

-কেন, পয়সা দিয়ে কী করবি?

-আমাদের ক্লাসের ইউসুফকে দেবো। পয়সার অভাবে ও খাতা কিনতে পারে না।

-কেন, ওর বাবা খাতা কিনে দেয় না?

-দেয় না তো। ওর বাবা রিকশা চালায় তো, খাতা কিনতে পারে না। ওরা অনেক গরিব বাবা। টেনে টেনে বলে রবিন।

-তুই জানলি কী করে?

আমাকে সব বলে ও। জানো না বাবা, ও তো আমার বন্ধু।

এতো কথা বলার পর ছেলের হাতে দস্তার তৈরি দুটো দশপয়সা তুলে দেন ফখরুদ্দীন খান। এই যে, ওকে দশ পয়সা দিস  আর বাকিটা দিয়ে টিফিন কিনে খাস।

আট-ন’বছর আগের এ ঘটনাটির ছবি স্পষ্ট ভেসে ওঠে খান সাহেবের চোখের সামনে। মনে হয় এইতো সেদিনের কথা। সেই ছোট্ট রবিন আজ যুদ্ধে যাওয়ার সাহস করেছে, ভাবতেই বুকটা যেনো গর্বে ভরে ওঠে রবিনের বাবার। ডান হাত দিয়ে দুই চোখের কোল মোছেন তিনি। সবকিছুর পর তার চেহারায় একটা স্নিগ্ধ ভাব ঝিলিক দিয়ে ওঠে।

 

পর্ব-১২

মাঝরাত্তিরে মাঝি এসে দরজায় কড়া নাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে গেলো। ফখরুদ্দীন খান সাহেব আগে থেকেই সবকিছু গোছগাছ করিয়ে নিয়ে বারান্দায় বসে ছিলেন মাঝির অপেক্ষায়। দরজা খুললেন তিনি নিজেই।

-মিয়াভাই জাইগাই আছেলেন? ফিসফিস করে বললো জব্বার মাঝি।

-হ। আয়, ভিতরে আয়। কেউ দেখেনি তো?

-না, দেহে নাই। কেউ টেরও পায় নাই। আস্তে আস্তে বৈঠা বাইয়া আইছি।

-এক কাজ কর তুই, এই বোঝাগুলো নৌকায় উঠিয়ে চুপচাপ নৌকায় বসে থাক। আমি আসছি।

-তাড়াতাড়ি আইয়েন মিয়াভাই। ভাটা হইয়া গেলে উজান বাইয়া আউগান যাইবে না কিন্তু।

-তুই যা। আমি তাড়াতাড়িই আসছি।

জব্বার মাঝি বিছানাপত্র আর কাপড়চোপড়ের ব্যাগগুলো নিয়ে নৌকায় চলে যায়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফখরুদ্দীন খানও সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন। বাসা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সবার মনেই রবিনের কথা উঁকি দিলেও মুখ দিয়ে কেউ সে ব্যাপারে একটা কথাও উচ্চারণ করলো না। খালপাড়ে যাওয়ার পথের মোড়টা ঘোরার সময় সবাই একবার পেছন ফিরে বাসাটাকে দেখে নিলেন। আবার কবে ফিরতে পারবে তাদের সবার প্রিয় এ জায়গাটায় কেউ তা জানে না।

সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও শেষ সময় ঝামেলা বাধালো রবিনের পোষা কুকুরটা-জিমি। সবাই উঠে পড়েছে নৌকায়। মাঝি নৌকা ছাড়ছে। এমন সময় খালপাড়ে চুপচাপ বসে থাকা জিমির দিকে চোখ পড়লো খান সাহেবের।

-একটু থাম জব্বার। বললেন খান সাহেব।

-ক্যান, কী হইছে মিয়াভাই? জব্বারের কণ্ঠে আতঙ্কের ছাপ।

-কিছু হয়নি। ইশারায় কুকুরটাকে দেখালেন ফখরুদ্দীন খান।

-রবিন চাচার কুত্তাটা! ওইডারেও নেবেন?

কথাটা বলেই রবিনের কথা মনে পড়লো জব্বার মাঝির। মিয়াভাই, রবিন চাচায় কই? হ্যারে তো দেখলাম না। হ্যায় যাইবে না?

খান সাহেবের সব ছেলেমেয়েই জব্বার মাঝিকে জব্বার চাচা বলে ডাকে। মাঝিও তাদর সবার নামের সঙ্গে চাচা যোগ করে ডাকে।

ফখরুদ্দীন খান ডানহাতের একটা আঙুল ঠোঁটে ছোঁয়ালেন। মানে চুপ করতে ইশারা করলেন।

রবিন এখন যাবে না। ওর কথা পরে বলবো তোকে। এখন ওর কুকুরটাকে কী করবো? বললেন খান সাহেব।

-কুত্তাটা নৌকায় লইবেন মিয়াভাই? সামনের ডরার ওপর খাড়া করাইয়া লই? জিজ্ঞেস করলো মাঝি।

-হ্যাঁ, উঠিয়ে নিয়ে আয়।

জব্বার মাঝি পাড়ে উঠে কুকুরটাকে কোলে করে নৌকায় তুলে আনার চেষ্টা করলো। কিন্তু না, নৌকায় উঠবে না জিমি। হয়তোবা রবিনকে নৌকায় উঠতে না দেখে তারও নৌকায় ওঠার আগ্রহ নেই। শেষে অনেক জোরাজুরি করলো মাঝি। কিন্তু কিছুতেই নৌকায় তুলতে পারলো না জিমিকে।

অন্ধকারের মধ্যেও মাঝি খেয়াল করলো জিমির চোখে জল। অবলা প্রাণীরা নাকি যে কোনো বিপদ-আপদের কথা আগে থেকেই বুঝতে পারে। তাহলে কি সামনে কঠিন কোনো বিপদ এসে হাজির হচ্ছে তাদের? মনে মনে ভাবলো মাঝি।

ফখরুদ্দীন খান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

এই কুকুরটা একেবারে বাচ্চা বয়স থেকেই রবিনের সঙ্গে সঙ্গে থাকে। দেশি কুকুরগুলোর চাইতে বেশ বড়োসড়ো এ কুকুরটা। গায়ের লোমগুলোও বেশ বড়ো বড়ো। অথচ চলাফেরায় নরম নরম একটা ভাব।

একদিন কোথা থেকে যে সে এসে রবিনের সঙ্গে জুটেছিলো কেউ বলতে পারে না। কুকুরের বাচ্চাটিকে পেয়ে প্রথমেই রবিন বেগুনগাছের পাতায় করে ভাত খাইয়েছিলো তাকে। বেগুনগাছের পাতায় করে ভাত খাওয়ালে নাকি পোষা প্রাণীরা ভালো পোষ মানে। রবিনের মা বলেছিলেন কথাটা।

বেগুনপাতায় ভাত খাওয়ানোর জন্যই কি না কে জানে, সত্যি সত্যিই খুব পোষ মেনেছিলো কুকুরটা। অনেক ভেবে রবিন ওর নাম রেখেছিলো জিমি। রবিনের বাবা তখন বলেছিলেন, বেছে বেছে অতো বড়ো একজন লোকের নামটা পছন্দ করলি কুকুরটার জন্য? রবিন বলেছিলো, হোক বড়মানুষের নাম, আমার জিমি তার চেয়ে কম কীসে?

ধীরে ধীরে এমন অবস্থা হলো যে কুকুরটা রবিনের সঙ্গ ছাড়া থাকতোই না বলতে গেলে। প্রতিদিন সকালবেলা রবিন নিজের হাতে তাকে খাবার না দিলে খেতো না সে। তারপর রবিন যখন স্কুলে যেতো তখন স্কুলের গেট পর্যন্ত রবিনের সঙ্গে সঙ্গে যেতো জিমি। সবচেয়ে অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, স্কুল ছুটির সময়ও ঠিক ঠিক স্কুলগেটে উপস্থিত থাকতো জিমি।

একবার রবিনের হাত কামড়ে দিয়েছিলো জিমি। তখন জিমিও খুব ছোটো। পাশের বাসার নেড়ি কুত্তাটার সঙ্গে কামড়াকামড়ি করছিলো। ছাড়াবার জন্য মাঝখানে পড়ে গিয়েছিলো রবিন। ছোট্ট জিমি রাগ সামলাতে না পেরে কামড় বসিয়েছিলো রবিনের হাতে। ডাক্তার আসা পর্যন্ত রবিনকে শুইয়ে রাখা হয়েছিলো লিচুগাছটার নিচে ইজিচেয়ারে। কিছুক্ষণ পর কুকুরটাও এসে বসেছিলো রবিনের পাশে। সে হয়তো তার ভুল বুঝতে পেরেছিলো। কুকুরটার চোখে জল দেখে সেদিন আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন রবিনের বাবা।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে নৌকা ছাড়ার ইঙ্গিত করলেন খান সাহেব। জব্বার মাঝি নৌকা ছেড়ে দিলো। কুকুরটা বসে রইলো চুপচাপ। সে নড়লোও না চড়লোও না। তার চোখ থেকে শুধু অঝোর ধারায় ঝরে পড়তে লাগলো বেদনার অশ্রু।

 

পর্ব-১৩

বাড়ি থেকে পালিয়ে রবিন প্রথমেই গেলো শিশিরের খোঁজে।

রবিনদের বাসার পিছনে বিশাল এক বাগান। লোকে বলে কালিদাসের বাগান। বিশাল বড়ো বড়ো সব গাছপালায় ভরা সে বাগান। এই বাগানেরই দক্ষিণ দিকে রবিনদের বাসা। আর একেবারে উত্তর প্রান্তে শিশিরদের। রাতের বেলা বাগানের মধ্যে গা ছমছম করা ভয়।

কিন্তু ভয় পেলে তো চলবে না রবিনের। তাছাড়া সামনের দিকে বাজারের মধ্যের রাস্তা দিয়েও এতো রাতে চলাচল করা যাবে না। রূপনগর বাজার এখন পুরোপুরিই পাকিস্তানিদের দখলে। সঙ্গে আছে রাজাকার, আলবদর, শান্তি কমিটির লোকজন। কিন্তু গ্রামগুলো স্থানীয়দের দখলে।

স্থানীয়রা মানে মুক্তিযোদ্ধারা নয়, গ্রামের লোকজন স্বেচ্ছায় নিজেদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে পাহারা দিচ্ছে গ্রাম। তবে তাদের শক্তি খুব একটা বেশি নয়। রাজাকারদের সঙ্গে যুদ্ধে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা জয়ী হচ্ছে কিন্তু থানা শহর থেকে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী যখন আক্রমণ করছে, স্থানীয়রা তখন গ-ঢাকা দিচ্ছে। অবশ্য গা-ঢাকা দিয়ে নিজেদের গা বাঁচাতে পারলেও সহায়সম্পদ, বাড়িঘর বাঁচাতে পারছে না। তাদেরকে না পেয়ে তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে পাকিস্তানিরা। আবার মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো গ্রুপ যখন তাদের সঙ্গে যোগ দেয় তখন তারা হয় অপরাজেয় শক্তি। তখন তাদের সঙ্গে পেরে উঠবে এমন শক্তি পাকিস্তানিদের নেই।

এসব কথা মনে করতে করতে হাঁটছিলো রবিন। এমন সময় কাছেই কোনো একটা পাখি ডানা ঝাপটে উঠলো। হঠাত্ ডানা ঝাপটানোর শব্দে প্রথমে একটু কেঁপে উঠলো রবিন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আবার মনোবল ফিরে এলো তার। যে ছেলে দেশের জন্য যুদ্ধ করতে, দেশকে স্বাধীন করতে রওনা হয়েছে তার কি ভয় পাওয়া চলে? রবিনও এরপরে আর ভয় পাবে না বলে ঠিক করলো। কী হবে মিছেমিছি ভয় পেয়ে! মানুষের জীবনে মৃত্যু তো খুব স্বাভাবিক ঘটনা, যাকে এড়ানোর কোনোই উপায় নেই। আর দেশের এই অবস্থায় তো মৃত্যু কোনো ঘটনাই নয়। একজন, দুজন, তিনজন, চারজন কিংবা পাঁচ দশজন মানুষের মৃত্যুকেও মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করছে। রাজাকার বা পাকিস্তানিদের হাতে দু-দশজন মানুষের মৃত্যু কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পাকিস্তানিদের-সবই স্বাভাবিক ঘটনা।

হাঁটতে হাঁটতে বাগানের মাঝামাঝি জায়গাটায় এসে পৌঁছেছে রবিন। এ জায়গাটায় একটি বড়ো পুকুর। পুকুরের একদিকে বড়ো একটি বাঁধানো ঘাটলা। যদিও এ বাগানে দিনের বেলায়ও খুব একটা লোকজন আসে না, তারপরও এই নির্জন জায়গায় শান বাঁধানো ঘাটলা থাকার মানে বোঝে না রবিন।

এলাকার লোকজনের মুখে মুখে এই পুকুরটি নিয়ে নানা ধরনের গল্প শোনা যায়। এই পুকুরে নাকি কয়েক হাজার বছর বয়সের একটি শোল বা গজার মাছ আছে। মাছটি নাকি এতোই বড় যে একটি বড়োসড়ো মানুষ তার পিঠে উঠে দিব্যি বসে থাকতে পারে। মাছটির গায়ে নাকি নানান রংয়ের আলপনা আঁকা। পূর্ণিমার রাতে মাছটি পানির ওপর ভেসে আসে বলে বিশ্বাস করে এলাকার লোকজন। তখন যদি মাছটির কাছে কোনো কিছু চাওয়া যায় তবে মাছটি তা দিয়ে দেয় মানুষকে।

গাছপালার ছায়ার জন্য পুরো বাগানটিই অন্ধকার হলেও পুকুর এবং ঘাটলার বেশিরভাগ জায়গায়ই ফকফকে জোছনা। জোছনামাখা পুকুরঘাটটা এতোই ভালো লাগলো রবিনের যে সে গিয়ে ঘাটলায় বসলো। ঘাট সোজা পুকুরের ওপারেও একটা ঝাঁকড়া দেবদারু গাছ। তার মাশেই অন্য কী একটা গাছ রবিন তা চিনতে পারে না। সারা বাগানে কোনো জোনাক পোকা দেখেনি রবিন কিন্তু পুকুরপাড়ের সেই অচেনা গাছটায় ঝাঁক ঝাঁকে জোনাক পোকা দেখতে পেলো সে। জোনাক পোকার জ্বলা নেভা দেখে রবিন আজ নতুন করে অবাক হলো। হাজার হাজার জোনাক পোকা একই সঙ্গে, একই তালে জ্বলছে আর নিভছে। যখন সব জোনাক পোকা একসঙ্গে জ্বলে উঠছে তখন অদ্ভুত রকমের সুন্দর দেখাচ্ছে গাছটা।

জোনাক পোকার আরেক নাম নাকি আঁধার মানিক।

রবিনদের গ্রামের নামও আঁধার মানিক। ওরা অবশ্য দুটোকেই আন্ধার মানিক বলে থাকে। বরিশাল অঞ্চলের মানুষদের অবশ্য এটাই স্বভাব। চন্দ্রবিন্দুটাকে তারা পুরো একটা দন্ত্য ন বানিয়ে ফেলে। তারা আঁধারকে আন্ধার, বাঁদরকে বান্দর, চাঁদকে চান্দ, বাঁধাকে বান্ধা, রাঁধাকে রান্ধা বলে। তাই আঁধার মানিক তাদের মুখে আন্ধার মানিক হয়ে যায়।

জোছনা রাত দেখে রবিনের মনে হলো আজ হয়তো পূর্ণিমা। তাহলে তো আজ রাতেই ভেসে উঠবে আজব সেই মাছটি। মাছটির খোঁজে পুকুরের চারদিকে চোখ ফেরালো রবিন। না, কোথাও নেই। আজব মাছটিকে পেলে রবিন কী চাইবে? মনে মনে এক মুহূর্ত ভাবলো সে। কী চাওয়ার আছে তার এ মুহূর্তে!

যুদ্ধের কারণে মানুষের ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। অনেক ভেবে দেখলো রবিন, এ মুহূর্তে এ দেশের স্বাধীনতা ছাড়া তার চাওয়ার আর কিছুই নেই। একটি মাছ কি তার এ চাওয়ার প্রতিদান দিতে পারবে?

পারবে না। কারণ এ বড়ো কঠিন জিনিস। স্বাধীনতা কেউ কাউকে হাতে তুলে দেয় না। তাকে আদায় করে নিতে হয়। অর্জন কর নিতে হয়। যে করেই হোক স্বাধীনতা চাই-মনে মনে বললো রবিন। এরপর আবার উঠে হাঁটতে শুরু করলো শিশিরদের বাসার দিকে।

 

পর্ব-১৪

নৌকা ছেড়েই গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছে হলো জব্বার মাঝির। সব সময় সে তা-ই করে। ‘আর কতকাল ভাসবো আমি, দুঃখের সারি গাইয়া, আমার জনম গেল ঘাটে ঘাটে, ভাঙ্গা তরী বাইয়া’-গানটি চমত্কার দরদ দিয়ে গাইতে পারে জব্বার মাঝি। এর আগে জব্বার মাঝির নৌকায় যখন বাড়ি যেতেন ফখরুদ্দীন খান তখন নৌকা ছাড়ার পর তিনিই প্রথম বলতেন মাঝিকে-জব্বার, একটা গান ধর তো।

জব্বার বলতো, কোন গানডা গামু মিয়াভাই?

-গা তোর যেটা মন চায়।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাঝি গান ধরতো-আমার হাড় কালা করলাম রে, দেহ কালার লাইগা রে, অন্তর কালা করলাম রে দুরন্ত পরবাসী।

এইটুকু গাওয়ার পরই থামিয়ে দিতেন খান সাহেব। থাম থাম। এটা না। সেই গানটা ধর।

-কোনটা মিয়াভাই?

ওই যে, পরের বোঝা বইয়া বইয়া, নৌকার গলুই গেছে খইয়া-ওই গানটা।

মাঝি তখন গানটার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একমনে গাইতো আর আস্তে আস্তে বৈঠা চালাতো। মাঝে মাঝে দুয়েকবার অবশ্য চিত্কার করে বলে উঠতো-আপন বাঁয়। আপন বাঁয় মানে হলো নিজের বাঁয়ে। সামনে যে নৌকাটি আসছে সেটি যেনো বাঁ দিক দিয়ে বেয়ে আসে সেজন্যই ওই নৌকার মাঝিকে সতর্ক করে দেয়া।

আজও নৌকায় উঠে গান শুনতে ইচ্ছে হলো ফখরুদ্দীন খান সাহেবের। কিন্তু মাঝিকে তিনি কিছু বললেন না।

এতোক্ষণে রূপনগর বাজার এলাকা ছাড়িয়েছে নৌকা। আস্তে ধীরে কথা বললে তেমন সমস্যা নেই। সমস্যা যা হওয়ার তা হবে রাজাকারদের পাল্লায় পড়লে।

দীর্ঘ সময়ের নীরবতা ভাঙলেন খান সাহেব। রবিনের মাকে বললেন তিনি, ঘুমিয়েছো নাকি?

নৌকার পাটাতনের উপর তোশক-চাদরের সুন্দর বিছানা করে শুয়ে আছেন রবিনের মা। স্বামীর কথা শুনে পাশ ফিরে শুলেন তিনি। তারপর আস্তে করে বললেন, না।

একটা জিনিস আনতে ভুলে গেছি। পাকিস্তানি বা রাজাকারদের হাতে পড়লে না জানি কী হয় ওটার।

কী জিনিস?

-আমাদের পতাকাটা আনতে ভুলে গেছি।

-না, ওটা আমি নিয়ে এসেছি।

-কোথায় রেখেছো? পথে ওটার জন্য বাড়তি বিপদ হতে পারে।

-জানি। কিন্তু ওটাকে তো আর ফেলে দিতে পারি না। রেখেও আসতে পারি না।

-না, ফেলে দিতে বলছি না। কোথায় রেখেছো তাই জিজ্ঞেস করছিলাম।

-ও নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না।

-দেখো, কোনোরকম অপমান যেনো না হয় ওটার।

-না হবে না। জীবন থাকতে আমাদের পতাকার কোনো অপমান আমি হতে দেবো না। যে পতাকার জন্য নিজের ছেলেকে রেখে ঘর ছাড়তে হলো সে পতাকাকে কোনোভাবেই ছোটো হতে দিতে পারি না আমরা।

রবিনের কথা চলে আসায় আবারও নিশ্চুপ হয়ে গেলেন ফখরুদ্দীন খান। ওদিকে উজানের পথ পাড়ি দিয়ে ভাটির টানে তরতর করে ছুটে চলেছে নৌকা। বৈঠা বাওয়া বন্ধ করে মাঝি দাঁড়ের মতো করে ধরে রেখেছে সে বৈঠাটিকে। বৈঠাটি ডানে বাঁয়ে ঘুরিয়ে নৌকার দিক ঠিক রাখছে সে।

ছইয়ের সঙ্গে একটা হুঁকো দেখতে পেয়ে সিগারেট খাওয়ার খুব ইচ্ছে হয় খান সাহেবের। কিন্তু সিগারেট কম খাবেন বলে আজকাল আর সঙ্গে রাখেন না। আর সঙ্গে না থাকার কারণেই হয়তোবা ইচ্ছাটা আরও বেশি চাঙ্গা হয়ে ওঠে তাঁর।

আস্তে করে জব্বারকে ডাকলেন তিনি। জব্বার!

-জ্বে মিয়াভাই!

-তামাক আছে নৌকায়?

-আছে। খাইবেন আপনে?

-ধরা।

নৌকা কি বাইন্ধা লমু মিয়াভাই? নৌকা চালাইতে চালাইতে তো আর তামাক সাজাইতে পারমু না।

-নারে, নৌকা বাঁধার দরকার নেই। বৈঠাটা আমার হাতে দে, আমিই দিকটা ঠিক রাখি।

-আপনে পারবেন মিয়াভাই?

-কী যে বলিস? পারবো না ক্যান? দেশগ্রামের লোক আমরা। নৌকা চালাতে চালাতে, পানিতে সাঁতার কাটতে কাটতে বড় হয়েছি। দে, আমার হাতে দিয়ে তুই হুঁকাটা সাজা।

কিন্তু না, যতো সহজভাবে কথাটা বললেন খান সাহেব ততো সহজে হাল ধরতে পারলেন না তিনি। প্রচণ্ড স্রোত খালে। ঠিকমতো বৈঠা ধরার আগেই নৌকাটা একটা গোত্তা খেয়ে পাড়ের একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলো প্রায়। অনেক কষ্টে সামাল দিলেন শেষে। পরে অবশ্য সব ঠিক হয়ে গেলো। অভিজ্ঞ মাঝির মতোই হাল ধরলেন তিনি। তরতর করে এগিয়ে চললো নৌকা।

 

পর্ব-১৫

শিশিরদের বাড়িটা পুড়িয়ে দেয়ার পর ওরা ওদের বৈঠকখানা ঘরটিতে থাকছে সেটা আগে থেকেই জানা ছিলো রবিনের। কিন্তু এতো রাতে কীভাবে শিশিরকে ডেকে ঘরের বাইরে আনবে ভেবে পাচ্ছিলো না রবিন। বাবাকে রাজাকাররা মেরে ফেলার পর শিশিরের মনের অবস্থা কী তাও জানে না সে। এই মুহূর্তে শিশির হয়তো রবিনের সঙ্গে যেতে চাইবে না। না যাক, দরকার হলে রবিন একা একাই যাবে। তবুও শিশিরকে অন্তত একবার না জানিয়ে রবিন যেতে পারে না। সেজন্যই এতো রাতে এতো কষ্ট করে আসা।

শিশিরদের বৈঠকখানা ঘরের মধ্যে এতো রাতেও টিমটিম করে আলো জ্বলছে। ওর মা নিশ্চয় জেগে আছেন। এতো রাতে ওর মা কি ওকে বাইরে আসতে দেবেন? কীভাবে শিশিরকে ডেকে আনা যায় অনেকক্ষণ ভেবে ভেবেও কোনো কূলকিনারা পেলো না রবিন। শেষে ঠিক করলো সামনের দরজায় নক করবে ও। দরকার হলে সত্য কথাই বলবে। কী আর হবে। শিশিরকে হয়তো যেতে দেবে না। না দিক, রবিনকে তো আর আটকে রাখতে পারবে না। তাহলে একা একাই যাবে রবিন।

যাওয়ার ব্যবস্থা অবশ্য করেই এসেছে ও। রবিনদের যে ডোঙ্গা নৌকাটা সব সময় ঘাটের কাছে পানির মধ্যে ডুবানো থাকে সেটাকে রেডি করে বাগানের মধ্যের নালাটায় রেখে এসেছে সে। দুটো বৈঠাও যোগাড় করে রাখা হয়েছে। দুই বৈঠা দিয়ে রবিন আর শিশির বাইতে শুরু করলে সকালের অনেক আগেই সুন্দরবনে চলে যেতে পারবে।

রবিন গিয়ে দরজায় নক করার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে দিলেন শিশিরের মা-রবিনের মাসিমা।

রবিন আর শিশিরদের মধ্যে আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই। থাকার কথাও নয়। কারণ রবিনরা মুসলমান আর শিশিররা হিন্দু। কিন্তু দুই পরিবারের মধ্যে অনেক দিন থেকে এতোটাই সম্পর্ক যে মাসিমা সত্যি সত্যিই রবিনকে বোনপোর মতোই আদর করেন।

দরজা খুলেই মাসিমা বললেন, এসেছিস বাবা? কতোদিন পরে এলি! তোর জন্য রোজই সন্ধ্যাপূজার প্রসাদ রেখে দিই। কিন্তু তুই আসিস না।

বলতে বলতেই ছোট্ট পিরিচে করে চার-পাঁচটা বাতাসা আর কাঁসার গ্লাসে জল এনে রবিনের হাতে দেন তিনি।

কী করে আসবো মাসিমা, বাবা যে একদম বাইরে বেরোতে দেন না।

তাঁকে আর দোষ দিয়ে লাভ কী বাবা? দেশের যে অবস্থা তাতে কার যে কী করা উচিত বুঝতে পারছে না কেউই।

একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করলেন তিনি, আজই চলে যাবি? বাসায় সবাইকে বলে এসেছিস?

শিশিরের মায়ের প্রশ্ন শুনে আশ্চর্য হয়ে যায় রবিন। শিশির কি তাহলে সব বলে দিয়েছে? বলে দিলেও মাসিমা এতো সহজভাবে কী করে নিলেন ব্যাপারটাকে? তাহলে শিশিরকেও তিনি যেতে দেবেন? যাঁর এক ছেলে যুদ্ধে গেছে, স্বামীকে মেরে ফেলেছে রাজাকার বাহিনী, তিনি কি তাঁর বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন ছোট্ট এই বুকের ধনকে যুদ্ধে যেতে দিতে পারেন?

রবিনকে চুপ করে থাকতে দেখে মাসি আবার কথা বলে উঠলেন-ভাত বেড়ে দিচ্ছি, দুটো খেয়ে তারপর যা। শিশিরও তোর আশায় আশায় বসে আছে। ও জানে তুই যাওয়ার সময় ওকে নিশ্চয় সঙ্গে করে নিয়ে যাবি।

শিশির যাবে মাসিমা? অনেকটা উত্ফুল্ল হয়ে উঠলো রবিন।

যাবে না কেন বাবা, নিজের জন্মভূমির জন্য কিছু করার সুযোগ কি সবার হয়? তোদের সামনে যখন সুযোগ এসেছে, যা তোরা। এ যাওয়ায় দোষের কিছু নেই বাবা। তবে মনে রাখিস, ফিরে যদি আসিস কোনোদিন, তোদের হাতে যেনো বিজয়ের পতাকা শোভা পায়। শরীরে একফোঁটা রক্ত থাকতেও শত্রুকে দেখে ভয় পাস নে তোরা। আর রক্ত যদি দিতেই হয় তাহলেও মনে মনে সান্ত্বনা খুঁজে পাবি, প্রিয় জন্মভূমির মাটির সঙ্গে মিশে থাকবে তোদের রক্ত।

শিশির কোথায় মাসিমা?

পাশের রুমে। তুই খেয়ে নে, ওর সবকিছু রেডিই আছে।

এমন সময় দরজা ঠেলে রুমে ঢোকে শিশির। রবিনকে জড়িয়ে ধরে সে জিজ্ঞেস করে-এসেছিস? আমি জানতাম যে তুই আসবি। সেজন্য আগে থেকেই তৈরি হয়ে ছিলাম আমি।

তোরা যাবি কীভাবে, নৌকা পেয়েছিস? রবিনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন মাসিমা।

ভাড়া করা নৌকায় যাবো না মাসিমা। আমাদের ডোঙ্গা নৌকাটা নিয়ে যাবো।

বেশ বেশ, শরণখোলার এদিকটা নাকি পুরোপুরি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে। আমাদের রূপনগরের বেশিরভাগ ছেলে ওখানেই যুদ্ধ করছে। যারা ভারত চলে গিয়েছিলো তারাও নাকি ট্রেনিং শেষ করে ওদের সঙ্গে এসে যোগ দিচ্ছে।

একটু থেমে আবার বললেন মাসিমা, আর যে কোনো বিপদে-আপদে ধৈর্য রাখিস বাবা। ধৈর্য হারালেই মাথা কোনো কাজ করবে না। তখন বিপদ আরও বাড়বে।

 

পর্ব-১৬

ভোরের আলো উঠি উঠি করছিলো। খালপাড়ের গাছে গাছে পাখিরা সকাল হওয়ার আনন্দে, কিচির মিচির শুরু করে দিয়েছে। অদূরে গ্রামের কোনো মসজিদে বেসুরো গলায় আজান দিচ্ছেন বয়সী কোনো মুয়াজ্জিন। জব্বার মাঝি তখনও বেয়ে চলেছে নৌকা। শেষরাত্তিরে বারানির খালে কচুরিপানার জন্য নৌকা নিয়ে এগুতে পারেনি মাঝি। নইলে এতোক্ষণে খান বাড়ি পৌঁছে যেতো সে।

সামনে আর একটা গ্রাম। তারপরই বড়ো খাল ছেড়ে ডান দিকের ছোটো খালটি ধরে সামান্য সামনে এগুলেই ফখরুদ্দীন খানদের বাড়ির ঘাট।

সারারাত না ঘুমানোর পরে শেষরাতের দিকে সামান্য ঘুম ঘুম পাচ্ছিলো খান সাহেবের। তাই স্ত্রীর পাশের বালিশটিতে মাথা রেখে শুয়ে পড়েছিলেন তিনি। ঘুমিয়েও পড়েছিলেন। কিন্তু হঠাত্ যেনো কার বিকট আওয়াজের ডাকচিত্কারে ঘুম ভেঙে যায় তাঁর।

ওই মাঝি, কেডা যায় নাওয়ে? খালের অদূরে ওয়াপদার রাস্তা থেকে চিত্কার করে জানতে চাইলো কে একজন।

খান বাড়ির লোক। মাঝিও চিত্কার করেই উত্তর দিলো।

কোন খান? আইছে কোত্থিকা?

আন্ধারমানিক গ্রামের ইয়াজউদ্দিন খান বাড়ির লোক।

কোন খান? নাম কী?

ইয়াজউদ্দিন খানের নাতি ফখরুদ্দীন খান। রূপনগর গেছিলো ডাক্তার দেহাইতে।

নাও থামাও।

নাও থামান যাইবে না, নাওয়ে মাইয়া ছেইলা আছে।

থামাইতে হইবেই। কমান্ডার সাব চেক করবে হ্যারপর যাইবে নৌকা।

চেক করা লাগবে না। এই নাওয়ে খারাপ কিছু নাই। খারাপ কোনো লোকজনও নাই।

মাঝির উত্তরে মাথা গরম হয়ে যায় এস্কান্দার হাওলাদারের। রাজাকার কমান্ডার সোনাই মিয়ার ডানহাত সে। গ্রামের সবাই তাকে জল্লাদ এস্কান্দার নামে চেনে। নিজেকে প্রচণ্ড সাহসী হিসেবে পরিচয় দেয়ার জন্য শুধু জল্লাদের কাজই না, যতো ধরনের অপকর্ম আছে সবই সে করতে পারে।

মাঝির ওপর রেগে গিয়ে সে আরও জোরে চিত্কার করে ওঠে। ভালো মন্দের তুমি কি বোঝো? নাও থামাও। নইলে গুল্লি চালাইয়া সব ঝাঁঝরা কইরা ফালামু, আমার নাম এস্কান্দার হাওলাদার।

নৌকা থামাতে বলার সঙ্গে সঙ্গেই ছইয়ের মধ্যে উঠে বসেছিলেন ফখরুদ্দীন খান। প্রথম ধাক্কায় মনের মধ্যে একটু আতঙ্ক এসে ভর করলেও একটু পরেই সাহস ফিরে আসে তাঁর বুকে। দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধে গেছে যার ছেলে সে কিনা এই ঘৃণ্য রাজাকার ব্যাটাকে ভয় পাবে? কিছুতেই না। মাঝি আর রাজাকারটির কথা শুনতে শুনতে সে ভাবতে লাগলো, দেখা যাক কী হয়।

এমন সময় সেই চূড়ান্ত নির্দেশ আসে পাড় থেকে-নাও থামাও মাঝি, নইলে গুল্লি চালাইয়া সব ঝাঁঝরা কইরা ফালামু।

ফখরুদ্দীন খান আস্তে করে বলেন মাঝিকে-নাও থামাও জব্বার। ভয় নেই, আমি দেখছি।

আপনার দেখতে হইবে না মিয়াভাই। আল্লার কসম আপনের, আপনে চুপ থাইকেন। যা কওনের আমিই কমু।

এবার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে খান সাহেব বললেন, পতাকাটা সামলাও। পতাকা দেখলে কিন্তু ক্ষেপে যাবে ওরা।

নিজের কোমরে বাম হাতটা বোলান রবিনের মা। না, ঠিক আছে। জায়গামতো আছে পতাকাটা।

জব্বার মাঝি আস্তে আস্তে নৌকাটা পাড়ে ভিড়ায়।

খালের পারে ছোট্ট একখণ্ড জমি। সেখানে শাক-সবজির চাষ করেছে গ্রামের কোনো কৃষক পরিবার। তার পরেই ওয়াপদার বেড়িবাঁধ। সেই বেড়িবাঁধকেই গ্রামের লোকজন রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করছে। সেই রাস্তা থেকে জমির আল বেয়ে নৌকার দিকে এগিয়ে আসে দশ-বারোজনের একটি দল। তাদের পায়ের তলায় পিষ্ট হতে থাকে কৃষকের লাগানো শাক-সবজির গাছ।

দলের একেবারে সামনে নেতা গোছের একটি লোক। পরনে লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি। তাও মারা গোঁফ দুগালে। দাড়ি থাকলেও খুব বড় না, বোঝাই যায় তার দাড়ির বয়স খুব বেশি নয়।

নেতা লোকটির হাতে একটি তিন ব্যাটারির টর্চ লাইট। সম্ভবত এই লোকটিই এস্কান্দার হাওলাদার। পাশে অন্য একজনের হাতে রাইফেল জাতীয় কিছু একটা অস্ত্র। সেটি তাক করে ধরে আছে নৌকাটির দিকে। বাকি সবার কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে জ্বলন্ত বিড়ি বা সস্তা ব্র্যান্ডের সিগারেট।

নৌকার কাছে এসে নেতা লোকটি হুকুম দিলো-এই সার্চ কর।

প্রথমে বাধা দিলো মাঝি। থামেন, ভিতরে উঠবেন না। নাওয়ে ভদ্রমহিলা আছে।

কিন্তু চামচা গোছের একটি লোক সে বাধাকে পাত্তা না দিয়ে মাঝিকে একটা ধাক্কা মেরে উঠে গেল নৌকায়। ধাক্কাটা এতো জোরে মারলো যে জব্বার মাঝির খালে পড়ে যাওয়ার অবস্থা হলো। অনেক কষ্টে ছইয়ের সঙ্গে ঠেক দিয়ে নিজের পতন ঠেকালো সে।

প্রথম লোকটির পেছন পেছন আরও দুটো লোক লাফিয়ে নৌকায় উঠলো। নৌকা থামানোর আগেই ছইয়ের বাইরে এসে বসেছিলেন খান সাহেব। এবার উঠে দাঁড়ালেন।

ছইয়ের সঙ্গে একটা বিছানার চাদর গুঁজে দিয়ে পর্দা বানানো হয়েছিলো। প্রথম লোকটি কিছুটা নুয়ে পড়ে এক ঝটকায় পর্দাটা ফেলে দিলো। তারপর কমান্ডারকে উদ্দেশ করে বললো, নৌকার ভিতরে একজন মাইয়া মানুষ আর একটা বাচ্চা মাইয়া ছাড়া কেউ নাই।

পাটাতনের নিচে দেখ্। ওপর থেকে নির্দেশ এলো।

লোক তিনটি পাটাতনের কাঠগুলো সরিয়ে সরিয়ে উঁকিঝুঁকি দিতে লাগলো। কিছুই না পেয়ে আবার বললো, কিচ্ছু নাই ওস্তাদ।

ঠিক আছে উঠে আয়।

একে একে তিনটি লোকই নৌকা থেকে নেমে গেলো। এরপরে নৌকায় উঠলো টর্চ হাতে নেতা গোছের লোকটি। উঠে হাত মিলালো ফখরুদ্দীন খানের সঙ্গে। কিছু মনে করবেন না আপনাদেরকে কষ্ট দিলাম বলে। আসলে এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারটা তো আমাগোই দেখতে হয়। শালা মুক্তির বাচ্চারা দুদিন পরপরই ঠুসঠাস ফুটফাট কর। শালারা বাঁশের লাঠি দিয়া দ্যাশ স্বাধীন করবো! খাড়া, আর কয়টা দিন সবুর কর। তোগো বাপেরা আইয়া পড়ছে। স্বাধীন করাইবে তোগো দ্যাশ।

ফখরুদ্দীন খানও মনে মনে বললেন, তোগো বাপেরাও আইতে আছে হালার পো হালারা। আর কয়দিন সবুর কর। পাকিস্তানিগো দালালি করার সাধ তোগো জন্মের তরে মিডাইবেয়ানে।

এমনিতে ফখরুদ্দীন খান শুদ্ধ ভাষায় কথা বললেও মনে মনে গালিটা তিনি কেন যেনো আঞ্চলিক ভাষায়ই দিলেন।

 

পর্ব-১৭

জায়গাটাকে সুন্দরবন বলা হলেও এটি আসলে মূল সুন্দরবন না। বলেশ্বর নদীর মাঝখানে হয়তোবা অনেক অনেক বছর আগে জেগে উঠেছিলো বিশাল এক চর। দিনে দিনে সেখানেও একটা বন গড়ে উঠেছে। সুন্দরবনের সঙ্গে তফাত তেমন একটা নেই এই চরটির। সুন্দরবনে যা কিছু আছে তার প্রায় সবই আছে এই বনে। সুন্দরী গরান গেওয়াগাছ গোলপাতা হরিণ বানর সবই আছে, নেই শুধু সুন্দরবনের বাঘ। আর এজন্যই লোকজনের কাছে এই স্থানটি খুব প্রিয়। প্রতিবছর শীতকালে অনেক লোক এখানে পিকনিক করার জন্য যায়। অনেকে যায় শুধুই বেড়াতে।

রবিনও গেছে দুয়েকবার।

একবার স্কুলের এক পিকনিকে এসে খুব মজা করেছিলো ওরা। তখনও শিশির ছিলো। বিশাল এক নৌকা ভাড়া করা হয়েছিলো। স্কুলের পণ্ডিত স্যার প্রায় সারা পথ গান গেয়ে মাতিয়ে রাখেন সবাইকে।

পণ্ডিত স্যারের কথা মনে হওয়ায় মনটা খারাপ হয়ে যায় রবিনের। পণ্ডিত স্যার যে শুধু ভালো পড়াতেন তা-ই নয়, চমত্কার গানও গাইতেন তিনি। রবীন্দ্রসঙ্গীত যে এতো ভালো লাগতে পারে তা স্যারের গান শোনার আগে বুঝতে পারেনি রবিন।

রবিনদের বাসার সামনে একটা পুকুর। সেই পুকুরের ওপারেই থাকতেন পণ্ডিত স্যার। সবাই পণ্ডিত স্যার ডাকলেও স্যারের চেহারায় মোটেও পণ্ডিত পণ্ডিত ভাব ছিলো না। অল্প বয়স। বিয়েও করেননি তখনও। নির্জন সকালে নিজের বাসায় বসে গান গাইতেন স্যার-

আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে
জানি নে, জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না।
এই চঞ্চল সজল পবন-বেগে উদ্ভ্রান্ত মেঘে মন চায়
মন চায় ওই বলাকার পথখানি নিতে চিনে।
মেঘমল্লার সারা দিনমান।
বাজে ঝরনার গান।
মন হারাবার আজি বেলা, পথ ভুলিবার খেলা-মন চায়
মন চায় হূদয় জড়াতে কার চিরঋণে।

পুকুরের এপারের ঘাটলায় বসে একমনে সে গান শুনতো রবিন। একজন ছাত্র কীভাবে এতো ভালো একজন স্যারকে মারতে পারে ভাবতেই পারে না রবিন।

রবিনদের বাসার পাশ দিয়ে যে খালটি গেছে পশ্চিম দিকে, সে খাল সোজা গিয়ে মিশেছে বলেশ্বরের সঙ্গে। খালের মাথায় গিয়ে দশ মিনিটের মতো সময় নৌকা বাইলেই ওই চরে পৌঁছে যাওয়া যায়। খালের মোহনায় পানিও সামান্য। পুরো মোহনাটাই ডুবো চরে ভরা। তাই ঢেউও নেই বললেই চলে। দিনের বেলা জেলেরা পানির মধ্যে অনেকটা হেঁটে হেঁটেই খুঁচনি জাল দিয়ে মাছ ধরে এই নদীতে। বাকিটা তো খালই।

এইটুকু পথ রবিন আর শিশিরের জন্য নৌকা বেয়ে যাওয়া খুব একটা কঠিন নয়। এই চিন্তা করেই নৌকা নিয়ে রওনা দিয়েছিলো ওরা। কিন্তু কিছুদূর যেতে না যেতেই ওরা বুঝলো কাজটা এতো সহজ নয়। স্রোতের টানে নৌকা নিয়ে কোনোভাবেই এগুতে পারছিলো না ওরা। তাছাড়া অনেক জায়গায় খালপাড়ে এতো ঘন গাছপালা যে অন্ধকারে এক ভুতুড়ে পরিবেশের মধ্যে পড়তে হলো ওদেরকে। এভাবে কিছুদূর এগিয়ে একটা বড়ো ধানক্ষেতের কাছে নৌকা থামালো ওরা। এই জায়গায় বড় কোনো গাছপালা না থাকায় চাঁদের আলোয় দিনের মতো পরিষ্কার দেখাচ্ছিলো সবকিছু। ভাটা না হওয়া পর্যন্ত এই জায়গায় নৌকা থামিয়ে রাখবে বলে ঠিক করলো রবিন আর শিশির। ভাটার সময় খালের পানি নদীর দিকে যেতে থাকবে। তখন স্রোতই টেনে নিয়ে যাবে নৌকা।

নৌকা থামিয়ে পাটাতনের ওপর চিত্ হয়ে শুয়ে পড়লো দুজন। মাঝ আকাশে ভরা চাঁদ তখন নরম একটা আলো ছড়াচ্ছে। খালের পাড়ে কী একটা ঝাকড়া গাছের মাথায় জোনাকিরা জ্বলছে আর নিভছে। মনে হচ্ছে একসঙ্গে সবগুলো জোনাকি পোকা জ্বলে উঠছে আবার একসঙ্গে সবগুলো নিভে যাচ্ছে। দেখে বড়ো অদ্ভুত মনে হয় রবিনের কাছে।

স্রোতের পানি নৌকার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে কুলু কুলু শব্দে বয়ে চলেছে। দূরে ঘন ঘন ডেকে চলেছে একটা রাতপাখি।

ওদের মধ্যে প্রথম কথা বললো রবিন। ভয় করছে শিশির?

নারে।

তাহলে কথা বলছিস না যে।

চিন্তা করছিলাম।

মাসিমার কথা মনে পড়েছে বুঝি?

না, বাবার কথা চিন্তা করছিলাম।

তোকে খুব ভালোবাসতেন মেসোমশাই।

তোকেও ভালোবাসতেন।

কী করে বুঝলি?

পুজোর সময় আগে নিজে পছন্দ করে তোর জন্য জামা-কাপড় কিনতেন। তারপর আমাকে কিনে দিতেন।

আচ্ছা শিশির, মনে আছে, ছোটবেলা থেকেই তোর প্রচণ্ড ভয়। অন্ধকারের দিকে তাকাতেও ভয় করতি তুই। রাতে পড়ার টেবিলে বসে দরজা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাতে পারতি না। কোনো দিন সন্ধ্যার পরে বাইরে থাকার কথা তো চিন্তাই করা যেতো না।

হ্যাঁ, কিন্তু একদিন একটা বিপদে পড়েছিলাম।

কী রকম?

বিকালে মা বলেছিলেন কেরোসিন আনতে। গলায় রশি প্যাঁচানো কেরোসিনের বোতল নিয়ে গিয়েছিলাম খেলার মাঠে। ভেবেছিলাম কিছুক্ষণ খেলেটেলে তারপর বাজার থেকে কেরোসিন নিয়ে বাসায় ফিরবো। কিন্তু খেলতে খেলতে কখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে টের পাইনি। টের পেতেই দৌড়ে বাজারে গেলাম। কিন্তু কেরোসিন নিয়ে ফিরতে ফিরতে পথঘাট সব অন্ধকার হয়ে গেল।

এ পর্যন্ত বলে রবিনের দিকে পাশ ফিরে শুলো শিশির। রবিন জিজ্ঞেস করলো-তারপর? অন্ধকারে তুই  বাসায় ফিরলি কী করে?

বাজারের এই প্রান্তের দোকানটা পর্যন্ত এসেই থেমে গেলাম আমি। ওই দোকানটা থেকে বাসায় হেঁটে আসতে পাঁচ মিনিটের মতো সময় লাগে। কিন্তু এই পথটুকুর দিকে পা দিতে কিছুতেই সাহস হলো না। এভাবে অনেকটা সময় চলে গেলো।

কী করলি তখন?

একবার অনেক সাহস করে হাঁটতে শুরু করলাম। ভগবানকে ডাকতে ডাকতে অর্ধেকটা পথ এসে গেলাম। এমন সময় ঘটলো কাণ্ডটা।

কী কাণ্ড? আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো রবিন।

ধবধবে সাদা একটা ভূত দেখতে পেলাম সামনে।

ভূত! সত্যিকারের ভূত?

আরে না, বলছি।

একটু থেমে আবার বলতে লাগলো শিশির। সাদা লম্বা ভূতটা দেখার পরে কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। ভূত দেখে নাকি পেছনে দৌড়াতে নেই। ওদিকে সামনে পা চলছে না। শোঁ শোঁ শব্দে বাতাস এসে লাগছিলো গায়ে। চিত্কার করতে চাইলেও মুখ থেকে কোনো আওয়াজ বেরুচ্ছিলো না। শেষে পেছন ফিরে জোরে এক দৌড় লাগালাম। এক দৌড়ে বাজারের একেবারে মাঝখানে। রবিনকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে একনাগাড়ে বলে যেতে লাগলো শিশির।

দৌড়ে এসে জান তো বাঁচালাম, কিন্তু বাসায় ফিরবো কী করে? ওদিকে ভয়ে হাত পা তখনও কাঁপছিলো। এ অবস্থায় আবার ওইমুখো হওয়ার কথা ভাবতেই পারছিলাম না। অনেকক্ষণ রাস্তায় ঘোরাঘুরি করলাম আমাদের আশপাশের বাসার কাউকে পাওয়া যায় কি না। কিন্তু না, একজন লোকও পেলাম না। ওদিকে দোকানদাররা অনেকেই দোকান বন্ধ করে দিচ্ছিলো। ছোট দোকানদাররা তাদের হারিকেন বা কুপিবাতি বন্ধ করে টর্চলাইট হাতে যার যার বাড়ির পথে ফিরছিলো। দুয়েকটা বড় দোকানে তখনও হ্যাজাক বাতি জ্বলছিলো। সারা দিনের হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে তারাও একে একে বাড়ির পথ ধরলো সবাই। পুরো বাজারটাই তখন প্রায় অন্ধকার। তার মধ্যেই দূরে একটা হ্যাজাকের আলো দেখে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে অবশ্য কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। হ্যাজাক জ্বালিয়ে লাল শালু কাপড়ে সাদা বড়ো বড়ো অক্ষরে ব্যানার লিখছিলেন সাইনবোর্ড আর্টিস্ট পান্না। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আ. জব্বার মিয়াকে ভাইস চেয়ারম্যান পদে বোতল মার্কায় ভোট দিন। মাঝেই বড় একটা বোতলের ছবি।

মনে মনে ভাবলাম, যাক, বাসায় যদি ফিরতে না-ই পারি তাহলে সকাল পর্যন্ত এখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দেবো।

তাহলে সারারাত সেখানেই কাটালি? জিজ্ঞেস করলো শিশির।

না। রাত যখন বারোটা-একটা, তখন লেখা বন্ধ করে তুলিটুলি ধুয়ে গোছাতে শুরু করলো আর্টিস্ট। দেখে তো ভয়টা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো আমার।

শেষে তুই কী করলি বল না! তাড়া দিতে লাগলো রবিন।

শেষে বাবাই বিপদের হাত থেকে বাঁচালেন।

ও, তিনি বুঝি খুঁজতে বেরিয়েছিলেন তোকে?

না। তিনি ফিরছিলেন অফিস থেকে।

অতো রাতে অফিস থেকে ফিরলেন?

সে আরেক কাহিনী। অন্য একদিন বলবো। বাবার কথা আজ আর মনে করতে ভালো লাগছে না। তবে সংক্ষেপে এইটুকু বলি, রোগী দেখতে কোনো গ্রামে গিয়েছিলেন। তাই ফিরতে তার অতো রাত।

রবিন বললো, এতো ভালো একটা লোককে মেরে ফেলতে পারলো ওই আলী রাজাকারের দল!

শিশির মুখে কোনো কথা বললো না। তার বুক ফেটে বেরিয়ে এলো দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস। সে মনে মনে শুধু ভাবলো, এই দেশটা স্বাধীন করতে পারলে আলী মিয়ার জিহ্বাটা সে টেনে ছিঁড়ে ফেলবে। তারপর লাথি দিয়ে লাশটাকে গাঙের পানিতে ভাসিয়ে দেবে।

 

পর্ব-১৮

খুলনা থেকে পটুয়াখালীর দিকে পাকিস্তানিদের বিশাল এক বহর যাওয়ার কথা রয়েছে আজ রাতেই। ওদিকে বেশ কয়েকটা ছোটখাটো অপারেশনে জয়ী হওয়ার পর সুন্দরবন এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল এখন তুঙ্গে। তার ওপরে দুদিন আগে ভারত থেকে ট্রেনিং শেষ করে বড় একটি দল তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। সন্ধ্যারাত থেকেই নদীর দুই পাড়ে অপেক্ষায় আছে মুক্তিযোদ্ধারা। আজকের অপারেশনের নেতৃত্ব দেয়ার ভার পড়েছে মজনুর ওপর।

পুরো দলটাকে চারভাগে ভাগ করে অবস্থান নেয়া হয়েছে। মজনু নিজে আছে পুব পারে। খুলনার দিক থেকে পাকবাহিনীর নৌবহর এলে পুব দিক থেকেই আগে চোখে পড়ার কথা। যেহেতু আজকের অপারেশনের কমান্ডার পুব পারে তাই পুব পার থেকে আগে আক্রমণ শুরু করা হবে বলে ঠিক করা হয়েছে।

নদীর একেবারে পাড় ঘেঁষে বিভিন্ন শেল্টারে অবস্থান নিয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধারা। কমান্ডার মজনু রয়েছে একটু পেছনে।

পুব আকাশ তখন ফর্সা হয়ে উঠেছে। চোখের সীমানায় যা কিছু পড়ছে সবই প্রায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। এমন সময় ডান দিকে দূর থেকে অস্পষ্ট একটা ইঞ্জিনের আওয়াজ ভেসে আসতে থাকায় সবাই সজাগ হয়ে উঠলো। দূরবীণের আইপিসে বারবার চোখ রেখে এদিক ওদিক লক্ষ রাখছিলো কমান্ডার মজনু।

ডানদিক থেকে পাকিস্তানিদের আসার কথা থাকলেও কমান্ডার তার চোখ ঘুরাচ্ছিলো চারদিকেই। চারদিকে ভালো করে খেয়াল করতেই তার চোখের সামনে একটা ছোট ডোঙা নৌকা ভেসে উঠলো। দুই কিশোর তাড়াহুড়া করে চালাচ্ছিলো নৌকাটি।

বেশ একটা সমস্যায় পড়লো কমান্ডার। ডানদিক থেকে ভেসে আসা শব্দটা যদি সত্যি সত্যিই পাকিস্তানি বাহিনীর নৌযানের শব্দ হয় তাহলে মূল আক্রমণ যখন শুরু হবে তখন কিশোর দুটি থাকবে তাদের টার্গেটের আশপাশেই। ওদেরকে বাঁচাতে হলে এখনই থামাতে হবে ওদের। হামিদ অবস্থান নিয়েছিলো মজনুর খুব কাছাকাছি একটা জায়গায়। ইশারায় তাকে কাছে ডাকলো মজনু।

কী খবর কমান্ডার? কিছু দেখতে পাইতাছেন?

না, এখনও দেখা যাচ্ছে না। তবে খুব তাড়াতাড়িই এসে পড়বে। তাড়াতাড়ি একটা কাজ করতে হবে তোমাকে। রূপনগরের ওদিকের খালের মুখে একটা নৌকা দেখা যাচ্ছে। যে করেই হোক ওদেরকে ফেরাতে হবে। নইলে গোলাগুলির মধ্যে পড়ে যাবে নৌকাটি। যাও, যেমন করেই হোক ফিরাও ওদেরকে।

নির্দেশ পেয়ে ছুটে চললো হামিদ। কিন্তু ততোক্ষণে নৌকাটা পাড় থেকে বেশ খানিকটা দূরে সরে গেছে। চিত্কার করে ডাকলেও শুনতে পাবে না ওরা। এক মুহূর্ত চিন্তা করলো হামিদ। তারপর কোমরের লাল গামছা খুলে পতাকার মতো দোলাতে লাগলো।

হঠাত্ই সেটা খেয়াল করলো শিশির। এই রবিন, দেখ তো নদীর পারে লাল কী একটা দোলাচ্ছে কেউ একজন।

তাইতো। কী হতে পারে ওটা বল তো?

সম্ভবত কোনো সঙ্কেত দিচ্ছে কেউ।

নদীতে আমাদেরটা ছাড়া অন্য কোনো নৌকা নেই। নিশ্চয় আমাদেরকে কোনো সঙ্কেত দিচ্ছে।

আমারও তাই মনে হচ্ছে।

দূরে একটা ইঞ্জিনের শব্দ শোনা যাচ্ছে না?

হ্যাঁ।

কী করা যায় বল তো?

আমার মনে হয় সঙ্কেতটার দিকে যাওয়া উচিত আমাদের। কারণ এ অঞ্চলটা পুরোটাই এখনও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে। তাই আমাদের মনে হয় সঙ্কেতটাকে অনুসরণ করাই উচিত।

আমারও তাই মনে হয়।

সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে গেল নৌকার মাথাটা। কিশোর দুটো সঙ্কেত বুঝতে পেরেছে মনে করে হামিদও তার শার্টটা নামিয়ে ফেললো। কারণ পাকিস্তানিদের নৌবহর বাঁদিকে মোড় নিলে তাদের চোখেও পড়ে যাবে সঙ্কেত। তাতে পুরো বাহিনীটাই বিপদের মধ্যে পড়বে।

খুব বেশি সময় লাগলো না নৌকাটাকে পাড়ে আনতে রবিন আর শিশিরের। ততোক্ষণে অবশ্য অস্থির হয়ে উঠেছিলো হামিদ। নৌকার মাথাটা পাড়ে ভিড়তেই সেটাকে টেনে ধরলো সে।

তাড়াতাড়ি কূলে ওঠো। ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?

বলতে না বলতেই লাফিয়ে পাড়ে উঠলো দুজন। শিশির জিজ্ঞেস করলো, আপনি কে?

আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আরেকটু হলেই বিপদে পড়তে যাচ্ছিলে তোমরা। এসো আমার সঙ্গে। বলেই দৌড়াতে শুরু করলো হামিদ। পেছন পেছন রবিন আর শিশিরও দৌড়াতে লাগলো। নিজের শেল্টারের কাছাকাছি গিয়ে পেছনের দিকে ইঙ্গিত করলো হামিদ-দৌড়ে ওই বেড়িবাঁধের ওপাশে যাও। একটু পরেই গোলাগুলি শুরু হবে। অপারেশান শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওখানেই থাকবে তোমরা। তাছাড়া ওখানে আমাদের এ অঞ্চলের কমান্ডার জিয়াভাই আছেন। তোমাদের কী করতে হবে তিনি তোমাদের বলে দেবেন।

কথা শেষ করেই হামিদ ওদেরকে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলো। সঙ্গে সঙ্গেই রবিন আর শিশির ওয়াপদার বেড়িবাঁধের ওদিকটায় দৌড় শুরু করলো।

আজকের অপারেশানে নেতৃত্ব দেয়ার কথা ছিলো সুন্দরবন অঞ্চলের কমান্ডার জিয়াউদ্দিনের। কিন্তু মজনু তাঁকে আসতে দেয়নি। এ এলাকার ছোটখাটো অপারেশানের নেতৃত্ব এর আগে মজনুই দিয়েছে কিন্তু আজকের অপারেশানের গুরুত্ব বিবেচনা করে জিয়াউদ্দিন নিজেই নেতৃত্ব দিতে চাইছিলেন। কিন্তু মজনু বলেছে, বস, যুদ্ধটা আমরাই করি। আপনি শুধু দূর থেকে দেখেন আমাদের পরিকল্পনায় কেমন কাজ হয়।

অন্যসব মুক্তিযোদ্ধাও মজনুকে সাপোর্ট করে। কী আর করা! কমান্ডার জিয়াউদ্দিন একটা দূরবীণ নিয়ে অপারেশান এলাকা থেকে একটু দূরে বেড়িবাঁধের পেছনে ওদের প্রস্তুতির দিকে খেয়াল রাখছিলেন।

হামিদ যখন তার শেল্টার ছেড়ে দৌড়ে নদীর পাড়ে যাচ্ছিলো তখন থেকেই ওদের দিকে লক্ষ রাখছিলেন তিনি। তাঁর কাছাকাছি ওরা দুজন পৌঁছতেই হাত ইশারায় ডাকলেন। কাছে যেতেই বললেন, তোমাদের সঙ্গে পরে কথা হবে। এখন চুপচাপ আমার পেছনে বসে থাকো। একটু পরেই গোলাগুলি শুরু হবে। ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা পাকিস্তানিদের নাগালের অনেক বাইরে। এ পর্যন্ত আসার আগেই ওদের খেল্ খতম হয়ে যাবে।

তিনটি স্পিডবোট এসকর্ট করে নিয়ে যাচ্ছিলো দুটি লঞ্চকে। বহরটা চোখে পড়তেই চার জায়গায় অবস্থান নেয়া মুক্তিযোদ্ধারাই সতর্ক হয়ে কমান্ডারের নির্দেশের অপেক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রথম ফায়ারিং শুরু করা হয় লঞ্চ দুটো থেকেই। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ওরা আগেই টের পেয়ে গিয়েছিলো বোধহয়।

কিন্তু সামান্য একটু ভুল হয়ে গিয়েছিলো পাকিস্তানিদের। তাদের বহরের সামনাসামনি দূরের চরটার দিকে গোলাগুলি নিক্ষেপ করতে করতে এগুচ্ছিলো তারা। এদিকে নদীর দুই পারে অবস্থান নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে হয়তো তাদের কোনো ধারণা ছিলো না। হঠাত্ নদীর দুই পার থেকে যখন আক্রমণ শুরু হলো তখন তারা একেবারেই দিশেহারা হয়ে গেল। তিনদিক থেকে আক্রমণের মুখে স্পিডবোট তিনটি শুরুতেই ধ্বংস হয়ে গেল। লঞ্চ দুটো থেকে কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করেও কোনো লাভ হলো না। লঞ্চের ডেকেই ঢলে পড়লো কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা। কয়েকজন লাফিয়ে পড়লো পানিতে। কিন্তু সাঁতার না জানার কারণে অল্প সময়েই পানিতে তলিয়ে গেল তারা।

সেদিনকার অপারেশানে মুক্তিযোদ্ধাদের সামান্য ক্ষয়ক্ষতিও হয়নি। বরং প্রচুর গোলাগুলি তারা পায় লঞ্চ দুটোতে। এতোবড় একটি বিজয় এতো সামান্য চেষ্টায় সফল হয়েছে দেখে জিয়াউদ্দিনও খুশি হন তাঁর বাহিনীর ওপর। পিঠ চাপড়ে সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে সবাইকে নিয়ে ক্যাম্পে ফেরেন তিনি।

 

পর্ব-১৯

ক্যাম্পে ফিরেই শিশির আর রবিনকে কাছে ডাকলেন ক্যাপ্টেন।

-নৌকা নিয়ে কোথায় যাচ্ছিলে তোমরা দুজন?

-মাঝের চরে। উত্তর দিলো রবিন।

-সেখানে কী জন্য যাচ্ছিলে?

-মুক্তিযুদ্ধ করবো আমরা। শুনেছি মাঝের চরে মুক্তিযোদ্ধারা ঘাঁটি গেড়েছে।

-কোত্থেকে এসেছো তোমরা?

-রূপনগর থেকে।

-রূপনগর কোন বাড়ি তোমাদের?

-খান বাড়ি।

-খান বাড়ি! একটু যেনো চমকালেন ক্যাপ্টেন।

-তোমার বাবার নাম?

-ফখরুদ্দীন খান।

ফখরুদ্দীন খান তোর বাবা? আয় আমার কাছে আয়। রবিনকে হাত উঁচিয়ে কাছে ডাকলেন ক্যাপ্টেন।

হঠাত্ করেই তুমি থেকে তুই-এ নেমে গেলেন ক্যাপ্টেন। তার এ আচরণে রবিন কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেলো।

-তাইতো বলি এতোটুকু ছেলের এতো সাহস হয় কী করে! এখন বুঝলাম আমার ভাগ্নের সাহস থাকবে না তো কার থাকবে?

ক্যাপ্টেনের কথায় বিস্ময়ের মাত্রা আরও বেড়ে গেলো রবিনের। মায়ের মুখে শুনেছে রবিন-মায়ের এক চাচাতো ভাই একজন সাব-সেক্টর কমান্ডার। কিন্তু এই লোকই কি সেই? কমান্ডার হলে তো তাঁর যুদ্ধ করার কথা।

-আচ্ছা তোর মা কেমন আছে? কোথায় আছে সে?

-গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ার কথা ছিলো কাল রাতে। হয়তো চলে গেছে।

-তার মানে না বলে এসেছিস তোরা। আজ তো ছোটখাটো একটা যুদ্ধ দেখলি, কী মনে হচ্ছে পারবি যুদ্ধ করতে?

-পারবো।

এবার শিশিরকে কাছে ডাকলেন ক্যাপ্টেন।

-তোমার বাবার নাম কী?

-অরুণ হালদার।

-অরুণ বাবুর ছেলে? ওনাকে তো রাজাকাররা মেরে ফেলেছে, তাই না?

-হ্যাঁ। উত্তর দিয়ে নিচের দিকে চোখ রেখে চুপ করে রইলো শিশির।

-সুব্রত কোথায় আছে জানো?

এবার শিশিরের অবাক হওয়ার পালা। এই লোকটি দেখছি দুনিয়ার সব খবরই রাখেন। কে ইনি?

শিশিরকে চুপ করে থাকতে দেখে আবার কথা বললেন ক্যাপ্টেন। বললেন, বলছি সুব্রত কোথায় আছে, কী করছে, তোমার মা কি জানেন?

-না, জানেন না। শুধু জানেন যে দাদা কোথাও যুদ্ধ করছেন।

-তুমিও তো পালিয়ে এসেছো তাই না?

-না।

-তবে? তোমার মা তোমাকে এই অবস্থার মধ্যেও আসতে দিলেন?

-এমনিতেও আমরা খুব ভালো অবস্থায় ছিলাম না। আপনি তো সবই জানেন। বাবাকে মেরে ফেললো ওরা। বাড়িঘর সব লুটপাট করলো, জ্বালিয়ে দিলো। এর চেয়ে খারাপ অবস্থা আর কী হতে পারে?

-এখন কী করতে চাও?

-আমরা যুদ্ধ করবো। নিচের দিকে তাকিয়ে থেকেই উত্তর দিলো শিশির।

-আরে বোকা, এতো উতলা হচ্ছো কেন, আমরা আছি না! আমরাই যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করবো। তোমাদের মতো বাচ্চাদের জীবন নিয়ে খেলার দরকার নেই। এক কাজ করো। গোসল খাওয়াদাওয়া করে রেস্ট নাও। আজ রাতে আমাদের কিছু লোক যাবে রূপনগরের দিকে। ওদের সঙ্গে বাড়ি চলে যাও। যুদ্ধ করার জন্য শুধু সাহস থাকলেই হয় না, শক্তিও দরকার।

রবিন বললো, আমরা ফিরে যাবো না মামা। আমাদেরকে আপনাদের দলে নিয়ে নিন।

-আচ্ছা নিয়ে নিলাম। তবে সম্মুখযুদ্ধে যেতে পারবে না তোমরা। এই ক্যাম্পেই থাকবে। ক্যাম্পে অনেক ধরনের কাজ থাকে। সেগুলো করবে তোমরা।

শিশির আর রবিন মনে মনে ভাবলো, সে দেখা যাবে, আগে দলে জায়গা করে নিতে পারলে হয়।

ওদের কথার মাঝখানেই মজনু এসে হাজির হলো। এসেই ক্যাপ্টেনকে একটা স্যালুট করলো। মুখে বললো, কেমন দেখলেন ক্যাপ্টেন আমাদের অভিযান?

-শাব্বাশ। আরে এভাবেই তো দেশ স্বাধীন হবে।

-শিগগিরই আরেকটা অপারেশান চালাতে হবে। খুবই জরুরি অপারেশান। ক্যাম্পে চাল ডাল কিচ্ছু নেই। গ্রামের লোকজন অনেক কষ্ট করে, এমনকি নিজেরা না খেয়ে থেকে আমাদের সাহায্য করছে। কিন্তু এভাবে আর চলছে না।

-কী করতে চাও? জিজ্ঞেস করলেন ক্যাপ্টেন।

নদীর ওপারে সরকারি খাদ্যগুদাম ভর্তি চাল। অবশ্য কড়া পাহারায় রাখা হয়েছে গুদামটা। তারপরও আমরা সাকসেস হবো বলে আশা করছি।

-ঠিক আছে। তবে এবারে কিন্তু আমি পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পারবো না। অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করবো আমিও।

-না লিডার। আমরা বেঁচে থাকতে এইসব ছোটখাটো কাজে আপনাকে রিস্ক নিতে দেবো না আমরা। এই অপারেশানটাও আপনি শুধু দেখবেন। যা করার আমরাই করবো।

-বেশ করো। তবে খেয়াল রেখো, অকারণে যেনো আমাদের শক্তিক্ষয় না হয়। যুদ্ধের এখনও অনেক বাকি। যতোদিন বিজয় না আসে ততোদিন লড়াই চালিয়ে যেতে হবে আমাদের।

-আপনি ও নিয়ে ভাববেন না।

এবার রবিন আর শিশিরের দিকে চোখ ফেরালো মজনু। ওদের প্রসঙ্গ আসবে বুঝতে পেরে ক্যাপ্টেন নিজে থেকেই বলতে শুরু করলেন-ওরা দুজন তোমাদের খোঁজেই মাঝের চরের দিকে যাচ্ছিলো। যুদ্ধ করবে ওরা। অনেক চেষ্টা করেও ফেরাতে পারলাম না। কী আর করা। ক্যাম্পে রেখে দাও ওদের। কাজে লাগবে।

-কোত্থেকে এসেছে ওরা?

-রূপনগর থেকে। ও বলতে ভুলে গেছি, রবিনটা হচ্ছে আমার এক বোনের ছেলে। ওর মাকে ছোটোবেলা থেকেই অনেক জ্বালিয়েছি আমি। ওর মা তার আপন ভাইদের চেয়েও আমাকে কেনো যেনো একটু বেশি ভালোবাসে। আর ছোটোবেলা থেকেই সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়েছি আমি। দেশ স্বাধীন হোক, তোমাদের সবাইকে নিয়ে যাবো বুবুর বাড়িতে। দেখবে কী আপ্যায়নটাই করে বুবু।

এবার শিশিরের দিকে তাকালেন ক্যাপ্টেন। আর ও হচ্ছে সুব্রতের ভাই শিশির। তোমরা তো জানোই, শরণখোলার ওদিকটায় যে কটি ছেলে সাহস আর বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধে করছে তাদের মধ্যে সুব্রতও একজন।

মজনু একজন লোক ডেকে শিশির আর রবিনকে দেখিয়ে বললেন, ওদের নাশতার ব্যবস্থা করো। আমি পরে ওদের সঙ্গে কথা বলবো।

 

পর্ব-২০

তুষখালী খাদ্যগুদামের তিন দিকেই নদী। আর সামনের দিকটা দিয়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা চলে গেছে সোজা রূপনগর থানার দিকে। রূপনগর থেকে সাত-আট মাইল দূরে হলেও গুদামটির দিকে পাকিস্তানিদের রয়েছে কড়া নরজদারি। স্থানীয় রাজাকাররা তো আছেই, জেলা প্রশাসনের তরফ থেকেও বিশেষ খেয়াল রাখা হয় গুদামটির দিকে। তাই দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই কড়া প্রহরায় থাকে গুদামটি।

গুদামটির তিন দিক থেকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একটি দিক খোলা রাখা হয় শত্রুর পলায়নের জন্য। যেহেতু খাদ্যশস্য লুট করাই উদ্দেশ্য সেজন্য শত্রু নিধনের চেয়ে গুদামটি দখল করার দিকে গুরুত্ব দিয়েই আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়।

সন্ধ্যা থেকেই প্রস্তুতি চলছিলো মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে। প্রস্তুতি যখন প্রায় চূড়ান্ত তখন ক্যাম্পে এসে হাজির হয় সুব্রত। ক্যাপ্টেনকে কী একটা খবর জানাতে এসেছিলো সে। কিন্তু রাতেই গুদাম আক্রমণ করা হবে জানতে পেরে সে আর নিজের দলের কাছে ফিরে যেতে চাইলো না। রাতে অপারেশানে অংশ নেবে সে। তারপর কাল আবার ফিরে যাবে নিজের দলের কাছে।

শিশিরকে ক্যাম্পে দেখতে পেয়েও সুব্রত তেমন কোনো আপত্তি তুললো না।

বাবার মৃত্যুর খবর আগেই জানতে পেরেছিলো সে। মা কেমন আছেন জানতে চাইলো শিশিরের কাছে।

সুব্রতের বীরত্ব আর সাহসের কথা জানা ছিলো ক্যাপ্টেনের। সুব্রত যোগ দিলে দলের শক্তি বাড়বে বলে তিনিও সায় জানালেন সুব্রতের এ সিদ্ধান্তে। মাঝরাতের দিকে চূড়ান্ত আক্রমণ করা হবে। ক্যাম্প পাহারায় থাকবে তিনজন। শিশির আর রবিন ক্যাম্পেই থাকবে। বাকি সবাই অপারেশানে অংশ নেবে।

পরিকল্পনাটা শিশির বা রবিন কারওই খুব ভালো লাগলো না। কিন্তু করারও তেমন কিছু নেই। এমনিতেই ওরা খুব ছোট। অস্ত্র চালানো তো দূরের কথা, কোনোদিন ছুঁয়েও দেখেনি কেউ। এ অবস্থায় এতো বড় একটা অপারেশানে যোগ দেয়ার প্রশ্নই আসে না তাদের।

বিকালবেলায় নদীর পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে চিন্তা করতে লাগলো ওরা কী করা যায়। শিশির বললো, আজকের যুদ্ধে আমাদের আসলেই কিছু করার নেই। কিন্তু বসে থাকলে তো চলবে না।

তাহলে কী করবি?

আমরা পালিয়ে পালিয়ে দেখবো কেমন করে যুদ্ধ করে।

কিন্তু ক্যাপ্টেন টের পেলে আমাদের এখানে আর থাকতেই দেবেন না।

টের পাবেন না। তারা চলে যাওয়ার পর আমরা গোপনে তাদের পিছু নেবো। আবার তারা চলে আসার আগেই আমরাও ফিরে আসবো।

মাঝরাতের দিকে চূড়ান্ত অপারেশানে যায় মজনুর নেতৃত্বের দলটি।

গুদামের তিনদিকের নদী পার হয়ে আক্রমণ করতে হবে। নদী পার হওয়ায় ভয়ানক বিপদের ঝুঁকি আছে। শত্রুপক্ষের সার্চলাইটগুলো ঘুরে ঘুরে নদীর দিকে নজর রাখছে। তার মধ্য থেকেই গেরিলা কায়দায় ওপারে পৌঁছতে হবে। তারপর শত্রুসৈন্যদের সঙ্গে হাতাহাতি যুদ্ধে তাদেরকে পরাস্ত করে গুদামের দখল নিতে হবে।

এ কাজে সুব্রতের কোনো জুড়ি নেই। তবে সে একা পারবে না। কারণ নদীর দিকে অন্তত তিনজন সেনা অস্ত্র তাক করে আছে। তাদের তিনজনকে একবারে ঘায়েল করতে হবে। তারপর ওদিক থেকে যদি কোনো প্রতিরোধ আসে তারও জবাব দিতে হবে।

তিনটে কচুরিপানার ঢিপির আড়ালে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা এগিয়ে চলে শত্রুর চোখ ফাঁকি দিয়ে। নদী পার হয়ে প্রায় একযোগে তারা হামলে পড়ে তিনজন প্রহরীর ওপর। সহজেই কাবু হয় তারা। কিন্তু এর মধ্যেই টের পেয়ে যায় সামনের দিকের সৈন্যরা। তারাও এসে মুক্তিবাহিনীর দিকে প্রচুর গোলাগুলি নিক্ষেপ করতে থাকে।

প্রায় দুই ঘণ্টা আক্রমণ-পাল্টাআক্রমণের পর পিছু হটে শত্রুসেনারা। তাদের মধ্যে চারজন মুক্তিযোদ্ধাদের ছুড়ে মারা গ্রেনেডে সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়। দুজনকে আহত অবস্থায় বন্দি করে আনা হয়। ঠিক হয় দুই পাকিস্তানি সেনাকে পরদিন মুক্ত এলাকায় এলাকাবাসীর হাতে ছেড়ে দেয়া হবে। তারাই বিচার করবে এ দুজনের।

দখলের পরে গুদামের সমস্ত ফটক খুলে দেয়া হয়। গ্রামবাসীদের মধ্যে অনেকে মাথায় করে সেসব খাদ্যশস্য মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে দিয়ে আসে। মুক্তিযোদ্ধারাও তাদের সঙ্গে হাত লাগায়। আর সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে শিশির আর  রবিনও একসময় যোগ দেয় তাদের সঙ্গে।

মুক্তিবাহিনীর মধ্যে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি প্রথমে কেউ টের না পেলেও একটু পরেই সবাই জানতে পারে সুব্রতকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরদিন অনেক খোঁজাখুঁজি করে তার লাশ খুঁজে পাওয়া যায় খালের পাড়ে। এক পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে করতে কখন যেনো তার গায়ে একটা গুলি এসে লেগেছে। কিন্তু তারপরও সে পাকিস্তানি সেনাটাকে ছেড়ে দেয়নি। একসঙ্গেই হয়তো মারা গেছে দুজন।

সুব্রতের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের তাঁবুতে। সবাই একটা দিন মনমরা হয়ে কাটায়। শিশির একেবারেই স্তব্ধ হয়ে যায়। রবিনও তাকে সান্ত্বনা দেয়ার মতো ভাষা খুঁজে পায় না।

তিন দিন পর ভয়ানক এক আক্রমণ আসে বিপক্ষ দল থেকে। জল স্থল আকাশ তিনদিক থেকেই আক্রমণ করে বসে পাকিস্তানিরা। ক্যাম্প পাহারায় থাকা তিন মুক্তিযোদ্ধা কিছু বুঝে ওঠার আগেই জল এবং স্থলপথে আক্রমণের শিকার হয় তারা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আকাশপথেও বোম্বিং শুরু হয়। হঠাত্ এ আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধারা। সেদিন রাতের অপারেশানের পরই ক্যাপ্টেন চলে গেছেন। ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলো মজনু। প্রাণপণ চেষ্টা করেও কোনোরকম কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছিলো না তারা। মাত্র গতকালই রাইফেল চালানোয় হাতেখড়ি দিয়েছিলো রবিন আর শিশির। সেই নবিস হাত দিয়ে তারাও চালাতে লাগলো অস্ত্র। শিশিরের রাইফেলের গুলিতে তিন তিনটি পাকিস্তানি সৈন্যকে পড়ে যেতে দেখলো সবাই। কিন্তু তারপরও অদম্য শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসতে লাগলো শত্রুর দল। উপায় না দেখে সবাইকে পিছু হটতে আদেশ দিলো মজনু। কিন্তু রবিন আর শিশির তার আদেশের দিকে খেয়ালই করলো না। সমানে শত্রুর দিকে গুলি নিক্ষেপ করে চললো তারা।

চিত্কার করে বললো মজনু, শিশির, রবিন, আমি তোমাদের ক্যাপ্টেন বলছি। পেছনে ফিরে আসো তোমরা।

আদেশ শুনে গুলি চালানো বন্ধ করলো রবিন। শিশির অবস্থান নিয়েছিলো তার পাশেই। কী এক পাগলামিতে যে পেয়ে বসলো শিশিরকে তা কেউই বুঝতে পারলো না। রবিন গুলি চালানো বন্ধ করতেই মুহূর্তে শিশিরের বন্দুকের নল ঘুরে গেল রবিনের দিকে। কড়া গলায় আদেশ করলো সে, অস্ত্র হাতে তুলে নে রবিন। নইলে এখনই গুলি চালাবো।

ফিরে চল শিশির। নইলে মারা পড়বো দুজনেই। অনুনয়ের সুরে বলতে বলতেও অস্ত্র হাতে নিলো রবিন।

আবার জ্বলে উঠতে লাগলো দুজনের রাইফেলের নলের মুখ। ওদের এই প্রতিরোধে শত্রুসৈন্যরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো। সামনে এগুতে সাহস পেলো না তারা। এমন সময় একটি গুলি সরাসরি এসে লাগলো শিশিরের ঘাড়ের কাছে। ঢলে পড়লো শিশির। টের পেয়ে মজনু এসে কাঁধে তুলে নিলো তাকে। অন্যদের সঙ্গে পিছু হটে নিরাপদ আস্তানায় ফিরে এলো তাকে নিয়ে।

কিন্তু না, বাঁচানো গেল না শিশিরকে। অতিরিক্ত রক্তপাতের ফলে মৃত্যু হলো তার।

মূলত এই আক্রমণটিই ছিলো সুন্দরবন অঞ্চলে পাকিস্তানিদের শেষ মরণ কামড়। এরপরে আস্তে আস্তে দেশ এগিয়ে যেতে থাকে স্বাধীনতার দিকে। শিশিরের মৃত্যুর পর প্রথম প্রথম রবিন কিছুটা মুষড়ে পড়লেও কয়েকদিন যেতে না যেতেই বন্ধুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে বীরের মতো যুদ্ধ করতে থাকে সে। ষোলোই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণের পর রবিনও বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ি এসে রবিন সবকিছু ফিরে পেলেও তার কুকুর জিমিকে ফিরে পায়নি সে। রবিনরা ওদের বাসা ছেড়ে যাওয়ার পর জিমি হয়ে ওঠে ওদের পাড়াটার একক প্রহরী। জিমি যতদিন বেঁচে ছিলো শত্রুপক্ষের একটি লোকও ঢুকতে পারেনি ওদের পাড়ায়। শেষে একদিন কে যেনো গুলি করে মারে জিমিকে। জিমি আর শিশির ছাড়া স্বাধীন দেশে রবিন স্বাধীনতার কোনো মানে খুঁজে পায় না।

 

পর্ব-২১

চল্লিশ বছর পর।

রিমি গেলো তার দাদাবাড়ি বেড়াতে।

বিকালে চা-নাশতা খাওয়ার পর রিমির চাচাতো ভাইবোনেরা বললো, চলো রিমি আপু, আমাদের পাশের বাড়িতে অনেক সুন্দর সুন্দর ফুলের গাছ আছে। তুমি তো ফুল খুব ভালোবাসো। সেখান থেকে তোমাকে অনেক অনেক ফুল এনে দেবো।

শুনে রিমি তো ভীষণ খুশি। ঢাকা শহরের শাহবাগ থেকে আব্বু মাঝে মাঝেই ফুল কিনে দেয় রিমিকে, কিন্তু সেগুলো কেমন যেন মরা মরা। মনে হয় তাতে কোনো প্রাণ নেই। সেখানে ফুলগাছ থেকে ফুল তোলা তো দূরের কথা, ফুলগাছ দেখার ভাগ্যও হয় না কারও কারও।

রিমির দাদা রবিন খানের বাড়ির পেছনের বাগানের সামনে দিয়ে একটি ছোট্ট রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে। কোথায় গেছে তা রিমি জানে না। সেই রাস্তা দিয়ে খানিকটা হেঁটে আরও ছোটো একটি রাস্তা দিয়ে একটি বাড়িতে ঢুকলো ওরা। চারদিকে বেড়ার আড়াল দেয়া ছোট্ট একটা বাড়ি। বাইরে থেকে বোঝা যায় না এর ভেতরে কী আছে। সুপারি গাছের শুকনো পাতার বেড়া ফাঁক করে ওরা ঢুকলো বাড়ির ভেতর। ঢুকে তো রিমির চোখ ছানাবড়া। ছোট্ট জায়গাটার ঠিক মাঝখানে আরও ছোট্ট একটি টিনের ঘর। আর তার চারপাশে কতো রকমের কতো ফুলের গাছ তা গুনে শেষ করা যাবে না। মনে হয় ছোট্ট ঘরটিকে ঘিরে রেখেছে নানা ধরনের ফুলগাছ। সেইসব গাছের মাঝখান দিয়ে হাঁটাচলার জন্য সামান্য এক চিলতে জায়গা। বাকিটা সব ফুলগাছে ভরা। আর সেসব গাছে এতো এতো ফুল ফুটে রয়েছে যে দেখলে মনে হয় কোনো গাছেই কোনো পাতা নেই। মানে ফুলের আড়াল থেকে পাতারা বের হওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না। গোলাপ জবা গন্ধরাজ গাঁদা ডালিয়া বেলী ছাড়াও আরও কতো কতো ফুলের গাছ যে সেখানে আছে রিমি সেসব গাছের নামও জানে না।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইসব কথা যখন ভাবছিলো তখনই রিমি শুনতে পেলো কে যেনো চেঁচিয়ে বলছে, এই… কে ওখানে, আমার ফুলগাছে হাত দিয়েছিস তো আজ তোদের…

বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো এক বুড়ি। লাঠিতে ভর দিয়ে কুঁজো হয়ে হাঁটলেও চেহারায় তার যেনো আগুন ঝরে পড়ছে।

দেখে রিমি থ মেরে গেলো। তার সঙ্গীসাথীরা বুড়ির গলার আওয়াজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই হাওয়া। রিমি থ মেরে গেলো আর কিছুটা ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো যেখানে যেমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো ঠিক সেভাবেই।

দাঁড়িয়ে থাকবে না-ই বা কেন, রিমি তো আর বুড়িকে চেনেও না আর তার কথা জানেও না। মাত্র গতকালই ঢাকা থেকে আব্বু-আম্মুর সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে রিমি।

লাঠিহাতে বুড়ি বেরিয়ে এসে দেখতে পেলো রিমি একা দাঁড়িয়ে আছে। পায়ে জুতো মোজা, মাথার চুলগুলো সুন্দর করে সাজানো। এ মেয়েটিকে এ পাড়ার কোথাও দেখেছে বলে তো তার মনে হয় না। সে বুঝলো এ নিশ্চয়ই এ পাড়ার কোনো মেয়ে নয়। নিশ্চয়ই কারও বাড়িতে বেড়াতে এসেছে।

বুড়ি কিছুটা শান্ত হলো। রিমির কাছে এসে সে শান্তভাবে বললো, এই মেয়ে, কী নাম তোমার? কোথা থেকে এসেছো?

রিমি তার নাম-পরিচয় বললো।

বুড়ি বললো, কী জন্য এখানে এসেছো? কার সঙ্গে এসেছো?

রিমি বললো, ফুলগাছ দেখতে এসেছিলাম। আমার চাচাতো ভাইয়েরা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।

বুড়ি বললো, বুঝেছি। এ নিশ্চয় সুমন আর নবীনের কাজ। এ পাড়ার ছেলেমেয়েগুলো খুবই পাজি চাইপের। ওরা ভীষণ জ্বালায় আমাকে। আমি একা মানুষ। দিনরাত এইসব ফুলগাছ পাহারা দিয়ে রাখতে হয়। তারপরও সুযোগ পেলেই কে যে কোথা থেকে ফুল ছিঁড়ে নিয়ে পালায়! কেনো বাবা মিছেমিছি আমাকে এতো জ্বালাতন করিস তোরা! এইসব ফুল তো একদিন তোদের হাতেই তুলে দেবো আমি।

রিমি অনেক সাহস করে বুড়িকে বললো, বুড়িমা, আমাকে কিছু ফুল দেবে?

এ কথা শুনেই বুড়ির মুখ একেবারে অন্যরকম হয়ে গেলো। মনে হলো কে যেনো একদলা কালি এনে তার মুখে মেখে দিয়েছে, এমন কালো হয়ে গেলো তার মুখটা। তারপর বললো সে, ঠিক আছে, তোমাকে আজ আমি একটা ফুল দিচ্ছি। কিন্তু আর যেনো কোনোদিন ওই দস্যিগুলোর সঙ্গে ফুল চুরি করতে এসো না। মনে থাকবে তো?

রিমি মাথা নেড়ে সায় জানালো।

এতোশত ফুলের ভেতর থেকে একটি ফুল ছিঁড়ে দিয়ে বুড়ি রিমিকে তাদের দাদাবাড়ি পৌঁছে দিয়ে এলো।

সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে চাচাতো ভাইবোনগুলো রিমিকে বললো, জানো রিমি আপু, বুড়িটা না ভীষণ বদমেজাজী। তবে সব সময় নয়, যখন তার ফুলগাছে কেউ হাত দেয়, তখন। ফুলগাছগুলোকে সে নিজের জীবনের চাইতেও বেশি ভালোবাসে। সারা বছর সে ফুলগুলিকে যত্ন করে রাখে। বুড়ির সামনে কেউ তার ফুলগাছে হাত দেয়া তো দূরের কথা, তার বাড়ির আশপাশেও ভিড়তে পারে না। বুড়ি যদি বোঝে যে কেউ ফুল তুলতে তার বাড়ির আশপাশে গেছে তাহলেই লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে।

সুমন বললো, তবে বছরের একটি দিন অন্যরকম হয়ে যায় সে। দিনটি হলো ষোলোই ডিসেম্বর। ষোলোই ডিসেম্বরের তো মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। সেই দিন দেখো অন্যরকম এক বুড়িকে দেখবে।

দেখতে দেখতে ষোলোই ডিসেম্বর এসে গেলো।

সেদিন খুব সকাল সকালই সুমন আর নবীন রিমিকে নিয়ে গেলো বুড়ির বাড়িতে। গিয়ে রিমির তো চোখ ছানাবড়া। মনে হয় সারা গ্রামের সব ছেলেমেয়ে বুড়ির বাড়িতে হাজির হয়েছে। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের হইচই আর কলকাকলিতে অন্যরকম এক পরিবেশ হয়েছে সেখানে।

বুড়ি নিজের হাতে সব গাছের ফুল যত্ন করে একটা একটা করে তুললো। বড় একটা চাদরের ওপর সেগুলো জড়ো করলো সে। তারপর মুঠি মুঠি করে সেগুলো তুলে দিলো সব ছেলেমেয়ের হাতে। সবাই ফুল নিয়ে লাইন ধরে বাড়ির সামনের রাস্তাটি দিয়ে এগিয়ে চললো কোথায় যেনো। সবার হাতে সব ফুল তুলে দিয়ে বুড়ি একদৃষ্টিতে তাদের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো।

সবার সঙ্গে সঙ্গে রিমিও ফুল নিয়ে এগিয়ে চললো।

হাঁটতে হাঁটতে ওরা একটা শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে পৌঁছলো। সবাই সব ফুল ছিটিয়ে দিলো সেখানে। ওদের দেয়া ফুলে ফুলে ছেয়ে গেলো সমস্ত মিনার।

রাতে দাদুর কাছে বুড়ির আশ্চর্য সব কাণ্ডকারখানার কথা বললো রিমি।

দাদু বললো, বুড়ির চালচলনে তোমরা তাকে পাগল ভাবতে পারো। তাকে যদি কেউ না চেনে বা তার কথা না জানে তাহলে তা-ই ভাববে। কিন্তু ফুলবুড়ির জীবনটা আসলে খুবই দুঃখের। এই দুনিয়ায় তার কেউ নেই।

এই পর্যন্ত বলে দাদু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো । তারপর আবার বলতে শুরু করলো।

দুদুটো ফুলের মতো ছেলে ছিলো বুড়ির। দুজনই ছিলো খুবই বুদ্ধিমান। আর ভালো ছেলে এবং ভালো ছাত্র হিসেবেও খুব সুনাম ছিলো তাদের। এই এলাকার প্রতিটি লোকের বিপদে আপদে এগিয়ে আসতো তারা। তার মধ্যে ছোটোটা, নাম ছিলো শিশির, সে ছিল আমার বন্ধু। তারা দুজনই মাকে খুব ভালোবাসতো।

একদিন হলো কী, আমাদের দেশে একটা যুদ্ধ শুরু হলো।

সেটা ছিল উনিশশো একাত্তর সাল। তখন বাংলাদেশ আর পাকিস্তান একই দেশ। এক দেশ হওয়ার পরও পাকিস্তানিরা আমাদের সবকিছুতেই ঠকাতো। তাতে এ দেশের লোকজন গেলো ক্ষেপে। তারা স্বাধীনতা চাইলো। আর তাই পাকিস্তানিরা তাদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের, মানে এদেশের নিরীহ মানুষদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে দিলো।

যুদ্ধের শুরুতেই বড়ো ছেলেটি গেলো যুদ্ধে। আর সেই অপরাধে ছেলেটির বাবাকে মেরে ফেললো রাজাকাররা। পরে ছোটোভাই শিশির আর আমি একসঙ্গেই যুদ্ধে গেলাম।

একদিন বীরের মতো যুদ্ধ করতে করতে বড়োভাই সুব্রত শহীদ হলো। আর শিশির শহীদ হলো আমার পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে করতেই।

নয় মাস যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। যারা যুদ্ধে গিয়েছিলো তারা অনেকেই ফিরে এলো। বুড়িও অপেক্ষায় রইলো তার ছেলেরা ফিরে আসবে বলে। কিন্তু এলো না তারা। কেউ না বললেও একসময় সে বুঝে গেলো তার ছেলেরা আর ফিরে আসবে না।

সেই থেকে বুড়ি সারাবছর ধরে ফুলগাছ লাগায় আর ফুলগাছের পরিচর্যা করে। আর ষোলোই ডিসেম্বর বিজয় দিবসে সেই ফুল সব ছেলেমেয়েকে দিয়ে দেয় শহীদ মিনারে দেয়ার জন্য। বুড়ি শহীদ মিনারকেই তার ছেলে মনে করে। সে মনে করে শহীদ মিনারে ফুল দিলে তার ছেলেরা সেই ফুল পাবে আর তাতে তারা খুব খুশি হবে।

এসব কথা শুনতে শুনতে রিমির চোখ দিয়ে কখন যে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে সে নিজেই বলতে পারবে না। রিমি ভাবলো, সে নিজেও তো আজ শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে এসেছে। সেই ফুল পেয়ে ছেলে দুটো হয়তো আজও খুব খুশি হয়েছে।

 

বিঃ দ্রঃ উপন্যাসটির চরিত্রগুলো সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবের কারও সাথে মিলে গেলে সে দায়িত্ব লেখকের নয়।

Comments

comments